আমাদের দুই উগ্রবাদী সাইডের কেউই ডারউইনের থিওরি নিয়া আইডিয়া রাখে না। দুই সাইডই স্ট্রঙ্গলি বিশ্বাস করে ডারউইন বলছে বানর প্রজাতি বা প্রাইমেট থেকে মানুষ আসছে।
অথচ ডারউইন সাবের বিবর্তনবাদের মূল কথা ছিলো শক্তিমানরাই টিকে থাকে অর্থাৎ সারভাইভাল টু দি ফিটেস্ট। অনেকে আবার মেন্ডেলের জিনতত্ত্ব আর ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বকে বিপরীতমুখীও বানিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই দুইটা তত্ত্বই একে অপরের পরিপুরক।
ডারউইনের বিবর্তনবাদকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায় মেন্ডেলের জিনতত্ত্ব দিয়ে।
জীববিজ্ঞানের ইতিহাস শুধুমাত্র ডারউইনের একার না। ক্যারোলাস লিনিয়াসের দ্বিপদী নামকরণ এর ধারা থেকেই আমাদের কলাবিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছেন বান্দর থেকে মানুষ এসেছে, যেহেতু বানর আর মানুষ দুইটাই প্রাইমেট ফ্যামিলির। ডারউইন কখনো এটা বলেন নি এমন কি কোনো বিজ্ঞানীও কোনোদিন বলে নাই বান্দর থিকা মানুষ আইছে।
যেটা এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত থেকে পাওয়া যায় সেটা হলো, আজকের মানুষ অর্থাৎ আমরা যারা হোমো স্যাপিয়েন্স তারা টিকে গেছি অন্যান্য হোমো গণ (জেনাস) কে পরাস্ত করে। আমরা সবচেয়ে শক্তিমান ছিলাম এবং আমাদের পূর্বপুরুষের জ্বিনই তাই প্রকট হয়েছে এবং বংশানুক্রমে ছড়িয়ে পরেছে সারা পৃথিবীতে। এর মানে এটা নয় যে হোমো নিয়ান্ডারথাল, হোমো ইরেকটাস রা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তারা প্রচ্ছন্নভাবে রয়ে গেছে স্যাপিয়েন্সদের সাথে। আজকেও ইউরোপীয়ানদের জিনোমে ২% নিয়ান্ডারথাল কিংবা ইন্দোনেশিওদের জিনোমে ইরেক্টাসদের জ্বিন প্রবাহ রয়ে গেছে।
নিয়ান্ডারথাল, ইরেক্টাস বা অন্যান্য হোমো গণ এর প্রজাতিরা ছিলো মানুষই। তারা বানর গোত্রের ছিলো না। কিন্তু তারা স্যাপিয়েন্সের সাথে টিকে থাকার যুদ্ধে জয়ী হতে পারে নি। এইটাই ডারউইনিজম এর মূল কথা (মানুষের ক্ষেত্রে)। এখনো বিজ্ঞানে মানব বিভাজন একটা ট্যাবু। আর কলাবিজ্ঞানীদের পপুলার বিলিফের বিপরীতে এটা সত্য যে এরা একের পর এক আসে নি, এরা সমসামইয়িকই ছিলো, ইউরোপে যখন নিয়ান্ডারথালরা ঘুরচ্ছিলো তখন ইরেক্টাসরা ঘুরছিলো ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গলে, স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকা থে ছড়িয়ে পড়তেছিলো সারা পৃথিবীতে।
তারপরেও মানুষের তথা স্যাপিয়েন্সদের অনেক উপ প্রজাতি আছে যা রয়ে গেছে তাদের জিনোমের মধ্যে। যদিও অনেক জীববিজ্ঞানীই সমস্ত মানবজাতিতে স্যাপিয়েন্স এর ভিতরে ঢুকাতে নারাজ, যেখান থেকেই বিংশ শতকের প্রথমার্ধে নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদেরকে অন্য প্রজাতি ঘোষণা দেওয়া হয় (অবশ্যই যথেষ্ট প্রমাণাদিসহ), শুধু ইহুদি নয় সমস্ত মানবজাতিকে তারা বিভিন্ন প্রজাতিতে ভাগ করে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে ইউরোপিয়ান আর্য তথা আরিয়ানরাই সর্বশ্রেষ্ঠ, সেখান থেকেই মূলত এই হলোকস্ট এই নির্মম হত্যালীলা যা মানব বিভাজনকে ট্যাবু বানিয়ে ছেড়ছে।
আজকের যেমন বিভিন্ন জাতির শারীরিক ও মানসিক পার্থ্যক্য রয়ে গেছে তেমনি ছিলো সহস্র বছর পূর্বেও। তখন এই পার্থক্য আরো প্রকট ছিলো কারণ মিশ্রণের অভাব। আধুনিক গ্লোবালাইজেশনে মিশ্রণের কারণে নতুন নতুন মানব উপ প্রজাতির আবির্ভাব হচ্ছে। এইটাই ডারউইনিজম আর মেন্ডেলিজমের যোগসাজেস। প্রকট জিনোমগুলোই বংশানুক্রমে ছড়িয়ে পরছে।
বানর থেকে মানুষ আসে নি তেমন মানুষ থেকেও বানর আসে নি। বানর থেকেই বানর এসেছে, মানুষ থেকেই মানুষ এসেছে। আর এটা তো অবশ্যই নিশ্চিত যে শত সহস্র বছর আগের সকল মানুষের শারীরিক গঠন আর আধুনিক সকল মানুষের গঠন এক নয়। সময়ের সাথে সাথে অনেক জ্বিন হারিয়ে গেছে তেমনি হারিয়ে গেছে মানুষের উপ প্রজাতিগুলো।
এছাড়া কিছুদিন আগেওতো আফ্রিকান কালো মানুষ ও তাদের বংশধারাকে নিচু প্রজাতির বলে ধরা হতো। এইসব মানবসৃষ্ট মানব বিভাজন।
সবশেষে সুরা হুজুরাত এর ১৩ নাম্বার আয়াত,
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَـٰكُم مِّن ذَكَرٍۢ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَـٰكُمْ شُعُوبًۭا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا۟ ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقَىٰكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌۭ ..
ইয়া আইয়্যুহান্নাস, (হে মানবজাতি) নিশ্চই আমি তোমাদের তৈরী করেছি একক পুরুষ ও রমনী থেকে এবং তারপর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্ র নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক ন্যায়পরায়ন ও উত্তম চরিত্রের অধিকারি। অবশ্যই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সবকিছুর খবর রাখেন (আলিমুন খাবির)।
(পুরো আয়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দচয়ন হচ্ছে ইয়া আইয়্যুহান্নাস, আল্লাহ এখানে ইয়া বনী আদম (আদমের বংশধর) বলেন নি, বলেছেন ইয়া আইয়্যুহান্নাস অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতি। সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য কিন্তু রয়ে গেছে এখানে। আগ্রহীদের জন্য ইজতিহাদের সুযোগ ? )
