আমরা সবাই স্বাধীন, আমাদের এই স্বাধীনতা আছে যে চাইলে আজকেই আমি একটা রোলস রয়েস কিনতে পারি। কিন্তু খুব অল্প কিছু মানুষেরই সেই স্বাধীনতাটা ফলাবার ক্ষমতা আছে। ঢাকায় যখন আমি আছিলাম, আমার এই স্বাধীনতা আছিলো যে বসুন্ধরা বারিধারা কিংবা গুলশানের মতো পশ এলাকার যেকোনো এপার্টমেন্টে থাকার। কিন্তু এইটা হইতাছে একটা বিমূর্ত স্বাধীনতা যার কোনো বাস্তবিক মূল্য নাই। এই স্বাধীনতার সুযোগটা আমার মতো বেশিরভাগ বাঙালীর জন্য নয়।
আমাদের দেশে সংবাদপত্রের কথিত স্বাধীনতা আছে। কিন্তু এই স্বাধীনতা ভোগ করতে হইলে আমাকে হইতে হইবো বসুন্ধরার মালিক আনভীরের মতো কোটিপতি যার নিজের কয়েকটা মিডিয়া আছে যেইটার মাধ্যমে সে তার স্বাধীনতা ফলায়। কিংবা মতিউর রহমানের মতো প্রথম আলোর সর্বেসর্বা হওয়া যেইখানে আমার সম্পাদকীয় ও সংবাদ প্রকাশ দিয়া আমি আমার আইডিওলজিকাল চিন্তাভাবনা ছড়াইতে পারবো। আমাদের জন্য এইটাও হইতাছে একটা বিমূর্ত স্বাধীনতা। আর এই বিমূর্ততাটাই স্বাধীনতার বাস্তবতা।
রাস্তার ধারে পইরা থাকা ক্ষুধার্ত পথশিশুর কাছে গিয়া জিজ্ঞেস কইরা দেখতে পারো, ‘কেমন আছো তুমি?’ উত্তরে সে হয়তো কইবে ‘ভালো নেই’। ঘটনাক্রমে খিদার জ্বালায় সন্তানসহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়া মা এর সংবাদ যেই পত্রিকায় পড়েছিলাম সেই একই পত্রিকার অন্য পাতায় খুবসম্ভব দেখছিলাম ৮ একর যায়গা নিয়া ২৯ খানা মাস্টারবেডের বাড়ি কাজি ক্যাসেলের সংবাদ। এখন রাস্তার পাশে ফুটপাথে পইরা থাকা বুড়া মিয়ার কাছে গিয়ে কইতে পারো যে, ‘চাচামিয়া, জীবন আপনের কষ্টে যাইতাছে, হাতে হয়তো পাঁচ দশটাকা আছে, খাওয়া দাওয়ায় কষ্ট হয়, ঘুমাইতে কষ্ট হয়, মাংশ হয়তো খান নাই অনেক দিন, কিন্তু চিন্তা কইরেন না, আপনার স্বাধীনতা আছে।’ বুড়ামিয়া হয়তো উত্তরে কইয়া বইতে পারে, ‘হো বাপজান, না খাইয়া মরার স্বাধীনতা আছে। ‘
ইংরেজ কবি শেলী তার মাস্ক অব এনার্কি (Masque/mask of anarchy) কবিতায় স্বাধীনতা নিয়া বলতে গিয়া বলেছিলেন, স্বাধীনতার অর্থ এইটাও যে তুমি তোমার সন্তানদের জন্য একটা সুন্দর আগামী দিতে পারো, দরিদ্রতার ভয় থেকে স্বাধীনতা, যুদ্ধের ভয় থেকে স্বাধীনতা দিতে পারো,……। কিংবা বিনা চিকিৎসায় না মরার স্বাধীনতা, বিচারহীনতায় নির্যাতিত না হওয়ার স্বাধীনতা, কারো কাছ থিকা বাধ্য হইয়া এক টাকার একটা কাপড়ের টুকরা ১০০ টাকায় না কিনার স্বাধীনতা। এইটাই হইতাছে স্বাধীনতা, কিন্তু আমাদের এই এস্টাবলিশমেন্টের বুদ্ধিজীবীরা এইসব নিয়া কথা কইবেন না। ব্যাস্টিক অর্থে আসলে এই বাংলার বিশাল শ্রমজীবী আর কথিত মধ্যবিত্তের জন্যে এই স্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নাই। আইজ থিকা ৬০ কিংবা ৮০ বৎসর আগে যে স্বাধীনতা আছিলো আজকেও সেই একই কথিত স্বাধীনতা ভোগ করতাছে তারা।
