পশ্চিমা বিশ্ব সালাহুদ্দিন আইয়্যুবীকে মনে রাখলেও রুক্বন উদ্দিন বাইবার্সকে ভুলে যাতে চায়।
সালাহুদ্দিন জেরুজালেম জয় করলেও সকল দখলদার ক্রুসেডার স্টেটকে মুক্ত করেন নি। তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন ক্রুসেডারদের সমস্ত অপকর্ম, যদিও তিনি ক্ষমা করার কেউ ছিলেন না। তখনও ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়ার মধ্যে ক্রুসেডার স্টেট ছিলো (আক্রা, সিডন কেরাক, ত্রিপলি(লেবানন), তিয়ার, আন্তিয়ার্ক ইত্যাদি), আর দুইদিন পর পরই তারা হামলা চালাতো হজ্জ্বযাত্রীদের উপর।
মামলুক সুলতান রুক্বন উদ্দিন বাইবার্স সকল ক্রুসেডার স্টেট ধ্বংস করেন, সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেন সর্বশেষ ক্রুসেডার প্রাণটিকেও মিশর সিরিয়া ফিলিস্তিনের ভূমি থেকে।
এই সেই রুক্বন উদ্দিন বাইবার্স, আঈন জালুতের (১২৬০) যুদ্ধে থামিয়ে দিয়েছিলেন অপরাজিত মোঙ্গল বাহিনীকে, নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন বাগদাদ ধ্বংসকারী (১২৫৮) হুলাগু খান এর ইলখানেত আর্মিকে মাত্র দুই বছর পরেই। প্রতিশোধ নিয়েছিলেন বাগদাদের নিরপরাধ নারী শিশুদের হত্যাকারী কিৎবুকা এর শিরোচ্ছেদ করে। পুনঃস্থাপন করেছিলেন ধ্বংস হয়ে যাওয়া আব্বাসি খিলাফাতকে। তার রাজধানী কায়রো থেকেই আব্বাসী খলিফারা শাসন করেছেন এরপর থেকে ওসমান সুলতান সেলিমের মক্কা মদিনা দখলের আগ পর্যন্ত। এই জন্যেই তার কুনিয়াহ হলো রুক্বন উদ দ্বীন = দ্বীন এর স্তম্ভ।
বর্তমান ইউক্রেনের দক্ষিণ প্রান্তে কিপচাক তুর্কো-রুশ বংশে জন্ম নেওয়া সাদা চামড়ার নীল চোখের এই ব্যক্তিই থামিয়েছিলেন মোঙ্গল ধ্বংসযাত্রা। ইলখানেত আর গোল্ডেন হোর্ডকে রুখে দিয়েছিলেন বিরাট দাপটের সাথে। ইতিহাস আজো স্মরণ করে আঈন জালুত (Spring of Goliath) এর যুদ্ধের কথা। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের এই সেই ময়দান, যেখানে দাউদ (David) নবী হারিয়েছিলেন দানব জালুত (Goliath) কে। সেই একই মাটিতে বাইবার্স ধ্বংস করেছিলেন মোঙ্গল বাহিনীকে সুলতান ক্বুতুজের নেতৃত্বে। সেই ছিলো মোঙ্গল বাহিনীর প্রথম শোচনীয় পরাজয়। এরপর থেকে পতন শুরু হয় তাদের।
বালক বাইবার্স এর পরিবারকে হত্যা করে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয় বাইজানটাইন রোমানরা। ক্রিতদাস থেকে সুলতান হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নিজে ইউরোপীয় হওয়ায় ও বাল্যকালে ইউরোপীয় নিষ্ঠুরতার নির্মম শিকার হওয়ায়, ইউরোপীয় ক্রুসেডারদেরকে ইউরোপীয় তরিকাতেই নি:চিহ্ন করেছিলেন তিনি। এই সেই রুক্বন উদ্দিন বাইবার্স যার ভয়ে ৮০০ বছর পর্যন্ত কোনো ইউরোপীয়র দু:সাহস হয় নি ফিলিস্তিনে দখলদারের পা রাখার। তাই ইউরোপীয়দের রোমান্টিক হিরো সালাহুদ্দিন আইয়ুবী নয়, দরকার তাদের ত্রাস রুক্বন উদ্দিন বাইবার্স এর।
কিন্তু তারপরেও তার ইতিহাসের একটা কলঙ্ক রয়ে গেছে। আঈন জালুতে বিজয়ের পরে নিজ হাতে ততকালীন মামলুক সুলতান ও তার প্রতিদ্বন্দী বন্ধু সাইফুদ্দিন ক্বুতুজকে হত্যা করে নিজে হয়ে উঠেন মিসর-সিরিয়ার সুলতান।
