আজকে আমার এক আরব কলিগ কথা বলতে বলতে একসময় কইলো ইন্ডিয়ানরা কেনো এতো বেশি ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে এইটা সে এতোদিন পরে বুঝতে পারছে, যে দেশের জাতির পিতা একজন ইঞ্জিনিয়ার সেই দেশ থিকা ইঞ্জিনিয়ার আসবে এইটাই স্বাভাবিক।

আসলেই তো অবাক হওয়ার মতই কথা। আমি তো জানতাম মহাত্মা গান্ধী উকিল ছিলেন, তিনি যে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এইটা তো জানতাম না।

তারে কইলাম যে বাবা কাহিনী কি ডিটেইলে কও।

পোলায় কয়, ইঞ্জিনিয়ার কারামশান্দ গান্দি (অয় মিসরি, মিসরিরা জ আর গ রে মিলাইয়া ফেলে, অন্যান্য আরবরা জান্দি বললেও এরা মনে হয় এইজন্যেই গান্দি বলে, জামালরে এরা গামালও কয়। লিবিয়ানরাও মনে হয় এরকম জাদ্দাফি তাই গাদ্দাফি হয়ে যায়।) তো ইন্ডিয়ার জাতির পিতা তাই না? তো উনি তো ইঞ্জিয়ার, নিশ্চই বড় মাপের ইঞ্জিনিয়ার এইজন্যেই নামের সাথেই ইঞ্জিনিয়ার লাগানো। নরমালি তো বড় বড় মানুষ যারা ইঞ্জিনিয়ার তাদের নামের সাথে ইঞ্জিনিয়ার লাগানো থাকে না যদি না তারা আসলেই বিশাল মাপের ইঞ্জিনিয়ার হয়।

তখনো বিশয়টা খোলাসা না হওয়ায় কইলাম, ছোটভাই ইঞ্জিনিয়ার করমচাঁদ গান্ধী না, উনার নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। মোহনদাস !

এরপরে আবিষ্কার করলাম যে ইঞ্জিনিয়ার এর আরবী হলো মোহান্দেস। সুতরাং মোহান্দেস কারামশান্দ গান্দি/জান্দি তার কাছে হয়ে গেছে ইঞ্জিনিয়ার গান্ধী। (সেম কেসের ঘটনা ফেবুতে ত্বোহা ভাই এর সাথেও ঘটছিলো দেখছিলাম, কিন্তু তখন মাথায় এইটা আসে নি)

তখনই আমার মনে পরলো আরেকজন সত্যিকারের মহান স্থপতি ও ইঞ্জিনিয়ার এর কথা যার নাম হইতাছে মিমার শিনান/সিনান (Mimar Sinan)। আধুনিক ভাষায় তর্জমা করতে গেলে হইবো যে সিনান নামের লোক যে মিম (meme) বানায়। তুর্কি Mimar এর বাংলা হলো মহান স্থপতি (Grand Architect), আর এই মিমার ছিলো স্থপতি সিনান এর উপাধি।

আর্মেনিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া সিনান বালক অবস্থাতে ওসমানী সাম্রাজ্যের ‘দেভশিরমা’ বৃত্তি নিয়ে (বৃত্তি বলা ভুল হবে আসলে, অনেকটা জোর করেই এই বাচ্চাগুলাকে ধরে আনা হতো) ইস্তানবুলে মিলিট্টারি স্কুলে পড়তে আসেন। এই দেভশিরমা বৃত্তিধারী ছাত্রদের মধ্যে থেকেই বের হয়ে আসতো ভবিষ্যত ওসমানী মিলিটারি কমিশন্ড অফিসার, আমলা, মন্ত্রী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার তথা জাতির সর্বোচ্চ মেধাবীরা।

তো সিনান সাহেব এই মিলিটারি স্কুল গ্রেজুয়েট হওয়ার পর মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন সর্বশ্রেষ্ঠ ওসমানী জেনিসারি কন্টিনজেন্টে। ২০ বছর কাজ করেন মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। মোহাচ ও বেলগ্রেডের যুদ্ধে তার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ওসমানীরা হারিয়ে দেয় অস্ট্রিয়ান জার্মান ও হাঙ্গেরিও সম্মিলিত বাহিনিকেও। ভিয়েনা পর্যন্ত পৌছে যায় সুলতান সুলেমান এর বাহিনী। সিনান যে শুধু ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তাও না, তিনি ছিলেন সুলতান সুলেমান এর স্পেশাল ফোর্সের একজন ‘হাসেকি/হাসেকাই’ বা সুলতানের দেহরক্ষী আধুনিক সময়ের হিসেবে Presidential guard.

সিনান এর ডিজাইন করা যুদ্ধ জাহাজ নিয়েই ভূমধ্যসাগরে রাজত্য করে বেড়িয়েছেন আমির-উল-বাহর বারবারোসা। বারবারোসাকে সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনী এতোটাই ভয় আর সম্মান করতো যে, আজ পর্যন্ত ইয়রোপীয় স্ট্যান্ডার্ডে নৌ বাহিনীর সর্বোচ্চ খেতাব হচ্ছে আমির-উল-বাহর এর French পরিভাষা Admiral (Amir al Bahr > Amiral > Admiral)

মিলিটারি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ওসমানী সাম্রাজ্যের একজন আমলা হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘদিন তিনি একজন ডিপ্লোমেট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন তিনজন ওসমানী সুলতানের সালতানাতে, সুলতান সুলেমান, সুলতান দ্বিতীয় সেলিম ও সুলতান তৃতীয় মুরাদ।

তবে তাকে বলা হয় তিনি হচ্ছেন আধুনিক ইস্তানবুলের জনক। পুরো ইস্তানবুলের ৩০০ এরও অধিক ইমারতের ডিজাইন তার। সোজা বাংলায় বলতে গেলে সে সময়ের ইস্তানবুলের ৯০%ও অধিক বিল্ডিং তার ডিজাইনে তৈরী। শুধু তাই না, শাহজাহানের তাজমহলের ডিজাইনও সিনান এর ডিজাইন থেকে অনুপ্রানিত আর এই ডিজাইন যে তুর্কি উস্তাদ করেছিলেন উস্তাদ ইশা এফেন্দি, সিনান এর ভবশিষ্য। (তাজমহলের চিফ আর্কিটেক্ট ছিলেন উস্তাদ আহমাদ লহোরি, ইশা এফেন্দি ছিলেন ডেপুটি)।

তার হাতে তৈরী ছাত্ররাই পরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয় সিনান এর ডিজাইন, যে ডিজাইনে এমনকি আজকেও পৃথিবীর বেশিরভাগ মসজিদ তৈরী হচ্ছে। মসজিদের কথা মনে আসতেই যেই ডিজাইনটা আমাদের মাথায় আসে (গম্বুজ ও উঁচু চার মিনার, আর নতুন চাঁদ সাথে একটা পাঁচমুখী তারা) এইটা উনারই অবদান। এই চাঁদ তারা (crescent moon & star) ছিলো ওসমানী সাম্রাজ্যের নিশান বা প্রতিক। প্রতিটা মসজিদের মিনারে ও গম্বুজে এইটা ব্যবহার করেন সিনান। এই নিশানাটা পরে এতোটাই জনপ্রীয় হয়ে উঠে যে আজকে ইসলামের চিহ্ন হিসেবেও এই নতুন চাঁদ ও তারা বা শুধু চাঁদকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মিমার আঘা সিনান তার জীবনে কমপক্ষে ৯২টা বড় মসজিদ (Grand Mosque). ৫২টা ছোট মসজিদ, ৫৫ টা স্কুল, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, ৭টা ইসলামিক মাদ্রাসা, ২০টা দরগা, ১৭টা লাঙ্গরখানা, ৩টা হাসপাতাল, ৬টা বিশুদ্ধ পানি প্রবহনের খাল (aqueducts), ১০টা ব্রিজ, ২০টা সরাইখানা ( caravanserais), ৩৬টা প্রাসাদ, ৮টা রাজকীয় ভান্ডার (royal vaults) ৪৮টা হাম্মামখানা তৈরী করেছেন। তার মসজিদ তৈরীর স্পেশালিটি এতোই স্পেশাল যে তার ডিজাইন আজ মসজিদের সমার্থক হয়ে গেছে।

১৫৮৮ সালে ১০০ বছর বয়সে মারা যান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই মিমার সিনান। আধুনিক মিমারের হিসেবেও একজন খাটি মিমার হিসেবে তার সর্বশেষ কাজ ছিলো নিজের কবরের ডিজাইন করা। মরার আগেই তিনি নিজের কবরের ডিজাইন করে রাখছিলেন।

যাক গে ইঞ্জিনিয়ার গান্ধী থেকে শুরু হয়ে গল্প মিমার সিনানে এসে শেষ হলো।