১২ জুলাই, ১৫৭৬, বর্তমান ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজমহল (ততকালীন বাংলা সালতানাত) নামক স্থানে বাংলার স্বধীনতার সূর্য্য অস্তমিত হয় মুঘলদের হাতে৷ বাংলার স্বর্ণযুগের পতন হয় তাদের সর্বশেষ সুলতান দাউদ খান কররানী এর শাহাদাতের সাথে সাথে৷

দাউদ খান কররানী, স্বাধীন বাংলার সর্বশেষ সুলতান৷ আফগান বংশদ্ভুত সর্বশেষ বাঙালী যিনি মহাপ্রতাপশালী মুঘলদের বিরুদ্ধে বাংলার ঝান্ডা উড়িয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন ৪ টি বছর ধরে যেমনটা উড়িয়েছিলেন তার পূর্বসূরীরা, মুঘলদের গলার কাটা হয়ে৷ তার সাথে সাথে ধ্বংস হয় ভারতের প্রথম পরাশক্তির যারা ছিলো সত্যিকারের বাঙালী৷ ১৩৫২ থেকে ১৫৭৬ পর্যন্ত ২২৫ বছরের বাঙালী শাসন৷ শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ থেকে দাউদ খান কররানী পর্যন্ত৷

স্বাধীন বাংলা সালতানাত এর মানচিত্র।

১২ জুলাই দুপুর বেলা, সুলতান দাউদ খান, জেনারেল জুনাইদ খান, জেনারেল কুতলু খান, সিলেটি জেনারেল ইসমাইল খান (খাঞ্জা খান/খাঁজা খান) এবং একমেবাদ্বিতীয়ম জেনারেল কালাপাহাড় (ফরমুলি খান/রাজীব লোচন রায়/কালাচাঁদ রায়) এর কন্টিঞ্জেন্ট এর বিপুল দাপটের কাছে আকবরের সেনারা পিছু হটতে শুরু করেছিলো৷ বাম পাখনায় (Left Flank) সেনাপতি জুনাইদ খান, ডান পাখনায় (Right Flank) সেনাপতি কালাপাহাড়, মধ্যভূমিতে (Middle ground) সুলতান দাউদ খান ও সম্মুখে (Frontier) সেনাপতি কুতলু খান এবং পিছন সংরক্ষণে (backward reserve) সেনাপতি ইসমাইল খানের মাত্র ৫০ হাজার সেনা নিয়ে দেড় লাখ মহাজাতিক মুঘল সেনাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে হঠাৎ মুঘল কামানের আঘাতে ঢলে পরেন সেনাপতি জুনাইদ খান ও কুতলু খান৷ সেনাপতি ইসমাইল খানের নিষ্ক্রিয়তা ও সুলতান দাউদ খানের আহত হওয়ার পর একমাত্র সক্রিয় কন্টিঞ্জেন্ট ছিলো সেনাপতি কালাপাহাড়ের৷ একা কালাপাহাড় সকলদিক সামলাতে পারেন নি৷ মুঘল সেনাদের চাপে পিছু হটে কুতলু ও জুনাইদ কন্টিঞ্জেন্ট৷

পরাজয় নিশ্চিত টের পেয়ে ইসমাইল খান কালাপাহাড়ের কাছে মিনতি করেন আপাতত পালিয়ে যেতে ও গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে৷ জবাবে কালাপাহাড় বলেছিলেন, ”খাঞ্জা, তোমার/আমার মাতৃভূমি ওই বর্বর মোঙ্গল (মুঘলরা মোঙ্গল বলেই পরিচিত ছিলো) কুকুরদের হাতে ধর্ষিত হতে চলেছে আর তুমি আমাকে পালাতে বলছো? তুমি কি ভুলে গেছো আমি কে? আমি কালাপাহাড়! কালাপাহাড় কখনো কোনো যুদ্ধ হারে নি৷ হয় সে যুদ্ধ জিতবে নতুবা যুদ্দধের ময়দানেই শহীদ হবে৷ কালাপাহাড় কাপুরুষের মতো পালায় না৷”

কালাপাহাড়কে টলাতে না পেরে ইসমাইল খান একাই তার কন্টিঞ্জেন্ট নিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে তার জন্মস্থান সিলেটে পালিয়ে যান৷ এরপর বাঙাল সেনাদের পরাজয় ছিলো সময়ের ব্যাপার৷ স্বন্ধ্যের সময় পশ্চিম দিগন্তে সুর্য্য ডুবছে তেমনি সময় কালাপাহাড়ের শাহাদাতের মাধ্যমে ও আহত সুলতান দাউদ খানের আটকের মাধ্যমে শেষ হয় বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমল৷ যুদ্ধবন্দী সুলতান দাউদ খানকে নির্মমভাবে হত্যা করে বর্বর মোঙ্গল সেনাপতি রাজা টোডর মল৷ বাংলা পরিণত হয় মুঘল সুবায়৷ ইতিহাস সাক্ষী ৫০ হাজার বাঙ্গাল সেনার মধ্যে ৪৭ হাজার যুদ্ধের ময়দানেই শহীদ হয়, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেনি তারা, এমন কি তাদের সেনাপতির শাহাদাতের পরেও। একমাত্র ইসমাইল খান এর সিলেটি কন্টিঞ্জেন্ট এর একাংশ পালিয়েছিলো।

গুজব আছে যে সিলেটি সেনাপতি ইসমাইল খানের সাথে মুঘলদের পূর্ব থেকেই যোগাযোগ ছিলো৷ ইসমাইল খান শুধু সুলতান দাউদ খান এর একজন সেনাপতিই ছিলেন না তিনি একই সাথে ছিলেন দাউদ খানের জামাতা৷ ইসমাইল খানের লক্ষ্য ছিলো বাংলার সালতানাত৷ সেইজন্যেই হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন৷ পরে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর আমলে তিনি বাংলায় নবাবীও পেয়েছিলেন৷

সুলতান দাঊদ খান কররানী এর নিশান (পতাকা)

বি:দ্র: সুলতান শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ ছিলেন প্রথম বাংলার শাসক যিনি নিজেকে বাঙ্গালী ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তার সালতানাতের নাম বাংলার নামে দিয়েছিলেন। বাংলা সালতানাতের আমলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি হয় এবং বাঙ্গালী পরিচয় সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পরে। এই সুলতানী আমলেই শাহ মুহাম্মস সগীর, আলাওল এর মতো কবিরা বাংলায় সাহিত্য রচনা শুরু করেন। সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর আদেশেই কৃত্তিবাস প্রথম বাংলায় রামায়ন রচনা করেন। একই সময়ে সুলতানের প্রত্যক্ষ্য সহযোগিতায় শ্রী চৈতন্যের সাহচর্য্যে বৈষ্ণব পদাবলী ছড়ীয়ে পরে বাংলা ভাষায়। স্বাধীন বাংলা সালতানাত না আসলে বাংলা ভাষা ও পরিচয় হয়তো আজকের মতো এতো প্রকট হতো না, হারিয়ে যেতো কালের ছায়ায়।