পর্ব – ০১
নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি হইছি, গণরুমে থাকতে হবে তাই একটা ট্রাঙ্কের প্রয়োজন ছিলো। আব্বা পুরাতন একটা ফার্নিচারের দোকান থেকে কাঠের সিন্দুক টাইপের একটা ট্রাঙ্ক এনে দিলেন। ট্রাঙ্ক ভর্তি ছিলো পুরাতন কাপড় চোপরে ভর্তি। ময়লা হিসেবে ফেলে দেওয়ার সময় পাশের বেডের মামুন ছোট একটা বাক্স আবিষ্কার করে। বাক্সের ভিতরে অদ্ভুত একটা পকেট ওয়াচ, ব্রিটিশ আমলের কিছু পয়সা আর দুইটা বাঁধাই খাতা। খাতার প্রথম দিকে কয়েক পেজ হাবিজাবি কাঁচা হাতের ছবি, দুই একটা উর্দু কবিতা যার বেশিরভাগই নাকি মির্জা গালিবের (মামুনের ভাষ্য মতে, সে উর্দু সাহিত্যের ছাত্র)। এছাড়াও নানা সময় বিভিন্ন দেনা পাওনার হিসাব আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু ঘটনা প্রবাহ। দেখেই মনে হচ্ছে কোন সৈনিকের খেড়োখাতা৷ খাতার মুটামুটি মাঝখান থেকে লেখক অনেকটা নিজের আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করেছেন। সাদামাটা একঘেয়েভাবে বলে গেছেন নিজের জীবনের কথা। খাতা উল্টে পাল্টে পিছন দিকে দেখলাম ক্যালিগ্রাফি করে কিছু একটা লেখা। মামুনকে দেখাতেই সে বললো এখানে নাকি শওকত লেখা আছে। তারমানে এই খাতার মালিক হয়তো এই শওকত সাহেব। মামুন আর আমি পড়া শুরু করলেও কয়েক পাতা পড়ার পর ” ধুরু একটা মানুষ এতো বিরসভাবে যত্তসব পাগলের প্রলাপ লিখে কেমনে” বলেই মমুন বিরক্ত হয়ে ফোন টিপতে টিপতে চলে গেলো ব্যালকনিতে। কিচুক্ষণ পরেই শুনি শালায় ফিস ফিস করে প্রেম করতাছে। শালার উপরে হিংসাই হয়। আমিও খাতাটা রেখে দিয়ে খেতে চলে গেলাম। খাওয়া দাওয়া করে এসে বিছানায় বসে আছি। ফোন টিপতেও ভাল্লাগতেছে না। শেষে কোনো কাজ না পেয়ে আবার খাতাটা নিয়ে বসলাম। দেখি শওকত সাহেব কী বলার চেষ্টা করেছেন।
মা বাবার দ্বিতীয় সন্তান আমি । আমার বড় এক ভাই আছে । পরিবারের সবার খুব ইচ্ছে ছিল তাদের দ্বিতীয় সন্তানটা মেয়ে হবে আর মা তো মেয়েদের কাপড় চোপড়ও রেডি করে রেখেছিল । বাবাও চাইছিলে এবার একটা মেয়ে হোক , কারণ আমাদের বংশে মেয়ে নেই বলতে গেলে, আমার বাবারও কোন বোন ছিল না তাঁর বাবারও না তার বাবারও না । তাই সবাই একটা মেয়ে চাইছিল।
তবে সবচেয়ে বড় যে কারণটা ছিলো সেটা হলো আমার দাদাজান পীরসাহেব স্বপ্নে দেখেছিলেন এই সন্তান ছেলে হলে তাদের পীরকির সিলসিলায় মোহর লেগে যাবে। সোজা বাংলায় পীরতন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে বংশে আর কোন পীর আসবে না। শতপুরুষ ধরে তাদের এই পীরতন্ত্রের ব্যবসা সেই আওরঙ্গজেব এর আমল থেকে। এইটা বন্ধ হয়ে গেলে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।
তখন মা নাকি স্বপ্নেও দেখেছিলেন কোন এক সুদর্শন পুরুষ তাকে এসে বলছেন যে আমি মেয়ে তাই সবার মনেই ছিল অনাবিল আনন্দ। সেই আনন্দে পানি ঢেলে দিয়েই আমার জন্ম ।
আসল ব্যপারটা পরে আমাদের পারিবারিক ধাত্রী আমাকে বলেছিলেন , বাবা নাকি বলেছিলেন আমি যদি ছেলে হই তবে এবরশন করানো হবে । এবং বিভিন্নভাবে বাতেনী বিদ্যার দ্বারা তারা অনাগত সন্তানের লিঙ্গ নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চালান। তাই আমাকে বাঁচাতে মা মিথ্যা স্বপ্নের আশ্রয় নিয়েছিলেন। জন্মের পরেও নাকি বেশ কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিলো, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে প্রত্যেকবারই অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই আমি। সবই অবশ্য শুনা কথা, আমার তেমন কিছু মনে নেই।
শেষ পর্যন্ত হত্যাচেষ্টা বাদ দিয়ে আমাকে অস্বীকার করার চেষ্টা হয়। এতে অবশ্য কিছুটা সফলও হয়েছিলেন তারা।
জন্মের পর থেকেই অবহেলার শিকার হয়েছি আর তখন থেকেই মেয়েদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে বড় হয়েছি । সবসময় নিজেকে ছোট মনে হতো। মনে হতো জন্মানোর চেয়ে না জন্মানোই ভালো ছিলো। আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলাম কয়েকবার। কিন্তু বিধিবাম মরতে পারি নি।
একথা বলাই বাহুল্য যে আমাদের পরিবার খুবই প্রভাবশালী ছিল তাই ধাত্রী মহিলাকে খুবই খারাপভাবে অপমান হেনস্তা করা হয় । নিঃসন্তান মহিলা পরে চেয়েছিলেন আমাকে তার কাছে নিয়ে পালন করতে । কিন্তু এখানেও বাগড়া বাঁধার আভিজাত্যের উন্নাষিকতা। তিনি আমাকে নিতে পারেন নি বরং আরো অপমানিত হন । আমার জন্মের পর আমার বাবা আমাকে একটা ভাল জিনিসই দিয়েছে এটা হচ্ছে একটা বিশাল নাম । বংশীয় ঐতিহ্যের মধ্যে একটাই আছে আমার নামটা শাহজাদা শেখ মোহাম্মাদ শওকত আল শাহরিয়ার ইয়ামেন ইবন….. বাকিটা আর বলতে চাইনা । পরে অবশ্য আমি নামটাকে ছোট করে ফেলেছিলাম সব বাহুল্য দূর করে ।
ছোটবেলা থেকেই একা বড় হয়েছি । আমি যখন বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই মা আমার থেকে অনেক দূরের মানুষ । সারাদিনে মাত্র একবার দেখা হত তাও আবার রাতে খাওয়ার সময় । আমাদের বাড়ির পুরাতন নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির বড় বৌ রাতের খাবারটা সবাইকে নিজ হাতে তুলে দিত । আমি সারাদিন এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করতাম । মাকে কখনো মা বলে ডাকিনি , দাইমা (ধাত্রী) বলেছিলেন তাঁকে মা ডাকতে কিন্তু পারি নি । আর বাবার কাছেই কখনোই কখনো যেতাম না ভয়ে বাবা ডাকাতো দূরের কথা।
বাবার সাথে আমি প্রথম কথা বলি যখন আমার মেট্রিকুলেশন এর রেজাল্ট দিয়েছে আমি সব বিষয়ে লেটার গ্রেড পেয়েছি তখন । আমাদের বংশের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট । এর আগে কেউ মেট্রিক পাশ করেনি । আসলে সম্পত্তি ছিল তাই কেউ লেখাপড়া নিয়ে চিন্তা করনি । লেখাপড়া যা হতো তাও ছিলো নিজেদের মাদ্রাসায়। আমি যেহেতু অচ্ছুৎ ছিলাম তাই তাগুতি স্কুলেই পড়াশোনা করেছিলাম।
আমি নিজের পরিবারে থেকেও একঘরে ছিলাম । চাকর বাকর রা ছাড়া আর কেউ আমার খবর নিত না । থাকাটাও হতো বাড়ির রাখাল ফরিদ চাচার সঙ্গে গোয়াল ঘরের একপাশে। ফরিদ চাচা মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে বলতো, ‘আহারে বাপজান, আল্লাহর কি লীলা। আমি হইতাছি বান্দীর পুত আর তুমি পীরজাদা, কিন্তুব্দেখো একলগে এক ঘরে থাকি। আল্লাহ এই জুলুম সহ্য করবো না। দাঁতে কামড় দিয়া সহ্য কইরা যাও বাপ, তোমার ভিতরে আগুন আছে একদিন এই আগুনে সব ছাড়খার হইয়া যাইবো।’ ফরিদ চাচার কাছে বিভিন্ন গল্প শুনতাম। আমার পূর্বপুরুষদের গল্প, তাদের অলৌকিক কীর্তিকলাপের গল্প। আমার নিরানন্দ জীবনের একমাত্র বিনোদনের উৎস ছিলো এই ফরিদ চাচা।
আমার লেখাপড়ার খরচটা পর্যন্ত বাবা দেন নি । আসলে তিনি জানতেনই না যে আমি লেখাপড়া করি । আমার লেখাপড়ার আংশিক খরচ দিয়েছেন দাইমা, এই মহিলা তার আয়ের একটা অংশ খরচ করতেন আমার পিছনে। আর মেধাবী ছিলাম বলে হাইস্কুলে কোন খরচ ছিল না তার উপরে বৃত্তি পেতাম সেটা দিয়েই পুরাতন বইপত্র কিনতাম ।
রেজাল্টের দিন স্কুলের কালিপদ স্যার বাবাকে আমার খবরটা দেন । সারা থানায় এটাই সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট । বাবা বাড়ি এসে খুব রাগারাগি করেন , আমাকে মেরেওছিলেন। মারের চোটে আমার মনে হচ্ছিলো আমি হয়তো মরেই যাবো। প্রচন্ড মারের কারণে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলাম। বাবাও হয়তো মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে ক্ষ্যান্ত দিয়েছিলেন। তারপরও জন্মের ১৬ বছর পর বাবার প্রথম স্পর্শ , কেমন জানি লাগছিল । স্যারের অনেক সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও বাবা আমাকে পড়াতে রাজি হন নি। তিনি আমাকে বের করে দেন বাড়ি থেকে। এমন কি আমাকে এলাকাছাড়া করেন। এলাকায় পুনরায় আমাকে দেখা গেলে কিয়ামত হয়ে যাবে বলেও হুমকি দিয়েছিলেন৷
১৬ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে এসেছিলাম। বের হয়ে সোজা ঢাকা শহর। ঢাকায় তখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে৷ নবাব সাহেব ব্রিটিশদের সাথে মূলামুলি করে কলকাতার দাদাবাবুদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একটা বিশ্ববিদ্যালয় আদায় করেছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই একটা কলেজে আইএসসিতে ভর্তি হই। ঢাকার পিলখানায় নবাব সাহেবের অস্তাবলে ঘোড়া দেখাশোনার একটা চাকরীও যোগার হয়ে যায়। সবকিছুর পিছনে যে আমার স্কুলের সেই শিক্ষকের অবদান আছে এইটা পরে টের পেয়েছিলাম৷
আইএ পরীক্ষার ফলাফল ততোটা আশানুরূপ হয় নি। কোনোভাবে টেনেটুনে পাশ করার পর মনে হলো আর পড়াশোনার দরকার নেই অনেক হইছে। জীবনে অনেক মানুষ এসেছে গেছে কিন্তু তখন পর্যন্ত কেউ আপন হয়নি৷ একা ছিলাম একাই থাকতাম। আস্তাবলের পাশেই ছোট একটা খুপরিতে ছিলো আমার সংসার৷
আইএ পাশ করার পর কোলকাতায় চলে যাই। সাবেক রাজধানী কোলকাতা শহরে বিভিন্ন ধরণের বিভিন্ন ভাষার মানুষ। বাঙালী, পাঞ্জাবী, বিহারি, মারোয়ারী আরো কতো ভাষা। এরই ফাঁকে এক মারোয়ারী ব্যবসায়ীর আড়তে কেরানীর চাকরীটা পেয়ে যাই। কোলকাতা শহরে তখন আগুন জ্বলে। ব্রিটিশ খেদানোর আগুন। কংগ্রেস একদিকে তো মুসলিম লীগ আরেকদিকে। এর মধ্যে আবার আবুল কাশেম ফজলুল হক আর সোহরাওয়ার্দী সাহেব আরেকদিকে৷ রমরমা অবস্থার মাঝে আমিও জড়িয়ে পরলাম রাজনীতিতে৷
সুভাষ বাবুকে আমার ভালো লাগতো। এই লোকের ব্যক্তিত্ব ছিলো, ভাষণে আগুন ছিলো আর সবচেয়ে বড় কথা সাহস ছিলো। ইউরোপে তখন জর্মনদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এর আগুন বাংলায়ও লাগতেছিলো তখন৷ সুভাষবাবু জার্মানি – সোভিয়েত – জাপান ঘুরে এসে ঠিক করলেন যুদ্ধ করে ব্রিটিশ তাড়াবেন। এরই মধ্যে আবার কোলকাতায় শুরু হলো দুর্ভিক্ষ। জাপানের সাথে ব্রিটিশদের যুদ্ধ, সৈন্যদের জন্য সব খাবার ছিনিয়ে নেওয়া হলো, রাস্তায় মরে পরে থাকতে লাগলো ভূখা মানুষের লাশ। ব্যবসা সব লাটে আমার চাকরীও লাটে। না খেতে পেরে মরার দশা। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে!
সুভাষ বাবুর আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সাথে চলে গেলাম বার্মা। দেশ স্বাধীন করার চেয়ে বরং পেটে দানাপানি পরার জন্যই যাওয়া। শুনেছিলাম ফৌজের সাথে থাকলে নাকি দুই বেলা খাবার মিলে৷ বার্মায় জাপানীদের সাথে একজোট হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাই আজাদ হিন্দের কাজ। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পুরো হিন্দুস্তান দখল করা হবে।
বার্মা আসার পরেও দেখা গেলো খাবার দাবার এতোটাও ভালো না৷ তারপরেও কোনোকিছু না পাওয়ার চেয়ে তো সামান্য কিছু পাওয়াটাই ভালো। এখানে এসেই দেখা হলো জয়নবের সাথে। আমার জীবনটা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য তার একটা ইশারাই যথেষ্ট ছিলো।
শুরু হলো আমার এক অদ্ভূত জীবন। জীবনে প্রথম নারী এলো। এলোমেলো হয়ে গেলো সবকিছু। নারী যে ঘৃণার জিনিস নয়, ভালোও বাসা যায় সেইটার প্রথম অনুভূতি। বার্মার আবহাওয়ায় প্রচন্ড কলেরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানেই জয়নবের সাথে পরিচয়, জয়নব ছিলো ক্যাম্পের নার্স। কলেরার প্রকোপে যখন মৃত্যুসহ্যায় তখন এই জয়নবই ছিলো আমার পাশে৷ সে আর কোনো রোগীর কাছে যেতো বলে মনে হতো না। এজন্যই হয়তো তাকে ভীষণ আপন মনে হতো। জয়নবের অমানুষিক পরিশ্রমে আর উৎসাহে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকি। ততোদিনে তার প্রতি একটা মায়া পরে গেছে। এটাকেই বোধহয় ভালোবাসা বলে। জয়নবকে ভালোবাসার কথা বললে সে এক রহস্যময় হাসি দেয়। সেই হাসির অর্থ তখন বুঝতে পারি নি।
হাসপাতাল ছাড়ার আগে জয়নবকে শক্ত করে বলেছিলাম ভালোবাসার কথা। তার উত্তরটাও ছিলো তার হাসির মতোই রহস্যময়।
এইটুকু পড়ার পরেই মামুন এসে খবর দিলো পাশের রুমের বড় ভাইরা ডাকতেছেন পরিচিত হওয়ার জন্য। ধুর মাত্র কাহিনী জমছে আর এখনই ডাকাডাকি। খাতাটা বন্ধ করে বাক্সে রেখে ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে তালা মেরে বের হওয়ার সময় দেখি পকেট ওয়াচটা বিছানার উপর পরে আছে। আবার ট্রাঙ্ক খুলার সময় ছিলো না তাই ওয়াচটা হাতে নিয়েই বের হলাম। বাকিটুকু পরিচিত হয়ে এসে নাহয়ই পড়বো।
পর্ব_০২
পকেট ওয়াচের চেইনটা হাতে প্যাচিয়ে মামুনের সাথে পাশের রুমে সিনিয়রদের সাথে পরিচিত হতে গেলাম। গিয়ে দেখি প্রায় ২০ -২৫ জন পোলাপান সবগুলা আমাদের ব্যাচের কানে ধরে দাড়িয়ে আছে। কাহিনী কি বুঝলাম না! আমরা ঢুকা মাত্রই এক সিনিয়র বললেন ‘নবাবজাদাদের লেট হলো কেন? ঝটপট কানে ধরে এক পায়ে দাড়িয়ে থাক’। মামুন সাথে সাথে কানে ধরে এক পায়ে দাড়িয়ে গেলো, কিন্তু বিষয়টা আমার হজম হয় নাই। কানে না ধরেই দাড়িয়ে রইলাম। ‘ কিরে! কথা কানে যায় না? কানে ধরতে কইলাম না? নাকি হাতে সমস্যা আছে কান পর্যন্ত উঠে না? ‘ বলে এক সিনিয়র তেড়ে ফুরে কাছে এসে চর মারলেন একটা! ন্যাচারাল রিফ্লেক্সের কারণে আমিও হাত তুলে চর আটকানোর চেষ্টা করলাম। তখনই তিনি আমার হাতের চেন দিয়ে প্যাচানো পকেটওয়াচটা দেখতে পেলেন। ‘- আরে সর্ব্বোনাশ হাতে আবার ব্রেসলেটও লাগাইছেন দেখি। বিশাল বড় মাস্তান মনে করেন নাকি নিজেকে? চেন খুল হারামজাদা। ‘ আমি চেষ্টা করেও চেনের প্যাচ খুলতে না পারায় ওই সিনিয়র আবারো ঠাশ করে চর বসিয়ে দিয়ে নিজেই চেনটা খুলার চেষ্টা করলেন কিন্তু চেন এমনভাবে প্যাচিয়ে গেছে যে তিনি খুলতে পারেন নাই। উল্টো বেশি জোরাজুরিতে চেন কেটে বশে গেলো আমার হাতে রক্ত বেরিয়ে টপ টপ করে পরা শুরু করে। এরপরই ঘটে গেলো আমার জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা। সেই সিনিয়রটা ‘আমার হাত, আমার হাত’ করে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে সরে যেতে গিয়ে দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে নাক মুখ ফাঁটিয়ে আতঙ্কিত চোখে আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। উনার নাক দিয়ে টপ টপ করে রক্ত পরতে লাগলো।
রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখি যে প্রত্যেকটা চোখ আমার উপর নিবদ্ধ। হতভম্ব আমি স্যরি টরি বলে মাফ টাফ চাইলাম। ভাবছিলাম হয়তো সিনিয়রদের হাতে এখন মার খাইতে হইবো। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সিনিয়ররা একে একে সবাই বের হয়ে গেলেন। আমরাও সবাই বের হয়ে যার যার রুমে চলে এলাম। কেউ কোনো শব্দ করছে না, কথা বলার চেষ্টা করেও কারো কাছ থেকে কোনো সাড়া পেলাম না।
রুমে আসা মাত্রই মামুন হাত চেপে ধরলো। ‘দোস্ত, কামটা কি ঠিক করলি? এইভাবে একজন সিনিয়রকে পিটাইয়া আবার হুমকিও দিলি। এরা কি এখন তরে ছাইড়া দিবো মনে হয়?’ আমার তখন আকাশ থেকে পরার মতো অবস্থা। ‘হুমকি দিছি মানে! আমি হুমকি দিলাম কখন? আমি তো স্যরি কইরা মাফ চাইলাম।’ এরপর মামুন যা বললো তা বিশ্বাস করতে কষ্টই হচ্ছিলো আমার। কিন্তু যখন ব্যাচের অন্যরাও মামুনকে সমর্থন করলো তখন কনফিউজড হয়ে গেলাম৷ আমি নাকি প্রচন্ড জোরে ধমক দিয়ে সবাইকে বের হয়ে যেতে বলেছিলাম। মামুন তো কসম খাইয়া কইলো আমার চোখ থেকে নাকি লিটারেরি আগুন বাহির হইতাছিলো।
সিনিয়রদের সাথে এই আকাম করে আসার পর আর খাতাটা নিয়ে বসতে ইচ্ছা হয় নাই৷ আর কেন জানি খুব ঘুম পাচ্ছে তাই ঘুমিয়ে পরবো বলে বিছানায় শুয়া মাত্রই ঘুম৷
—- ‘সাফকাত, সাফকাত, ও সাফকাত।’ কে যেনো ডাকতেছে আমাকে। ধরমরিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। দেখি যে কেউ নেই৷ তবে ভয়াবহ কিছু একটা স্বপ্ন দেখেছি৷ স্বপ্নে দেখলাম ৩০ ৩৫ বছরের এক লোক মেহগনি কাঠের তৈরী একটা সিংহাসনে বসে আমাকে ডাকতেছে আর আমার হাতের পকেট ওয়াচটার দিকে ইঙ্গিত করে বলতেছে তার জিনিস তাকে ফেরত দিতে। আমি জিনিসটা দেওয়ার জন্য এগুতেই পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো। নিচে পরতে পরতে উপরে তাকিয়ে দেখি যে লোকটা হতাশভাবে মাথা নাড়ছে আর আমাকে পাগলের মতো ডাকছে। এমন সময়েই ঘুমটা ভেঙে গেলো।
এরপর আর ঘুম আসে নি। তাই খাতাটা নিয়ে বসলাম৷
জয়নবকে ভালোবাসার কথা বলার পর সে তার সেই রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো ‘হজরত, আমাকে হজম করার ক্ষমতা আপনার নেই। আমার কাজ আপনাকে সুস্থ করা। আপনি সুস্থ হলেই আমি চলে যাবো। তাই এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।’
জয়নবকে অনেক জোরাজুরি করার পরেও সে এই বিষয়ে মুখ খুলতে চায় নি। শেষে আমার অতিরিক্ত চাপাচাপিতে শুধু এইটুকুই বলেছে ‘আপনি পুরোপুরি সুস্থ হোন। তারপর বলবো। তবে একটা শর্ত আছে। আমার বিষয়ে কারো সাথে কোনো কথা বলা যাবে না।’
বললাম যে, ঠিক আছে। বলবো না।
হাসপাতাল হিসেবে যে তাবুতে আছি আমি সেখানে আরো অরায় ৩০টা বেড আছে। প্রত্যেকটাতেই কোনো কোনো সৈনিক পরে কাতরাচ্ছে। এতোদিন খেয়াল করি নাই৷ কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর খেয়াল করলাম আমার পাশের বেডেই একটা ছেলে হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে থাকে সবসময়। মাঝে মাঝে গুন গুন করে গান গায়। আর আমি যখন জয়নবের সাথে কথা বলি তখন কেমন জানি অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকায়। জয়নব ইদানীং একটু কম কম আসে, শুধু সন্ধ্যার সময় আর মাঝরাতে আসে। হয়তো সুস্থ হওয়ার পথে থাকায় এখন অন্যদিকে সময় দিচ্ছে, কিংবা আগেও এরকম সময়েই আসতো। দিনের বেলায় তাকে দেখলেও এতো কথা হতো না। কথা যা বলার রাতেই হতো।
ছেলেটার চাহনি আমার পছন্দ হয় নি৷ সে আবার জয়নবকে পছন্দ করে না তো! জয়নবকে এই কথা বলতেই সে হেসে উড়িয়ে দিলো। একদিন সেই ছেলেটাই এসে কথা বলতে লাগলো। আমাদের মধ্যে পরিচয় বিনিময় হলো। তার নাম সতীনাথ হালদার, বর্ধমানের ছেলে৷ ব্রিটিশ আর্মিতে ছিলো পরে জাপানীদের হাতে বন্দী হয়। সেখান থেকে সুভাষ বাবু সবাইকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। তখন থেকেই সবার মতো সেও আজাদ হিন্দ ফৌজে আছে৷ কথায় কথায় সে জিজ্ঞেস করলো আমি এতো কথা কার সাথে বলি। জয়নবের কথা বলতেই সে এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যেনো আমার মাথায় সমস্যা আছে! ছেলেটাকে আমার আসলেই সহ্য হচ্ছে না।
পড়তে পড়তে কখন সকাল হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। মামুনের ডাকে খাতাটা ট্রাঙ্কে রেখে বের হয়ে গেলাম। নাস্তা করে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। আজকে ওরিয়েন্টেশন ক্লাস আছে। পকেট ওয়াচটা সাথেই রেখেছি। জিনিসটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। কাল রাতের পর থেকে জিনিসটা আরো চক চক করতেছে৷ রক্তের এক ফোঁটাও চিহ্ন নাই। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে রাতে হাত কেটে চেন রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছিলো। হাতে যদিও কাটা দাগ আছে তবে চেন বা ওয়াচের কোথাও রক্তের কোন চিহ্ন নেই।
পর্ব_০৩
ওরিয়েন্টেশন ক্লাস শেষে বের হয়ে ফুড কোর্টে গিয়ে চা-বিড়ি খাইতেছি এমন সময় মেয়েটাকে দেখলাম। বটতলায় একা বসে আছে আর অদ্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাকালে তাকাক গে, আমার কি যায় আসে। মনোযোগ দিয়ে বিড়ি টানতেছি। দিনের অরথম বিড়ি একটু স্পেশালভাবেই টানা উচিত। তার উপর আবার চারিদিকে নজরও রাখতে হচ্ছে কোনো সিনিয়রের কুদৃষ্টি পরে কিনা৷ সকালেই মামুন অনেক কিছু বুঝাইছে। সিনিয়র মানেই হচ্ছে সাত খুন মাফ, জুনিয়রদেরকে চলতে হবে মাথা নামিয়ে। তার উপরে আবার প্রথম রাতেই সিনিয়রের গায়ে হাত তুলেছি। তাই আমাকে নাকি আরো সাবধানে থাকতে হবে। কোনোভাবেই ভুলক্রমেও বেয়াদবি করা যাবে না। সবকিছুর মাফ আছে বেয়াদবির মাফ নাই৷ তবে কোনটা বেয়াদবি আর কোনটা স্বাভাবিক তা সে বলতে পারে নাই। যাউজ্ঞা, মেয়েটা এখনো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! ব্যাপার কি! আমি কি হঠাৎ করে হ্যান্ডসাম হয়ে গেলাম নাকি! ফোনটা বের করে নিজের চেহারাটা দেখে নিলাম৷ নাহ, খারাপ না। একটু গ্রাম্য গ্রাম্য ভাব আছে তবে কাজ চলে। উঠে বিল দিয়ে বের হওয়ার সময়ও দেখি মেয়েটা তাকিয়ে আছে। প্রথমদিকে বিষয়টা ভালো লাগলেও বিষয়টা এখন বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে। পরিচিত নাকি! হতেও পারে।
যাই কথা বইলা আসি, হঠাৎ পিঠে প্রচন্ড থাবা ‘আরে, দোস্ত। কি অবস্থা?’ তাকাইয়া দেখি শালা মামুইন্যা, ‘একলা একলা চক্কর দিতাছোস কেন! ফার্স্ট ইয়ারের পোলাপান সবসময় একসাথে থাকতে হবে৷ তাইলে ইন্ডিভিজুয়ালি মারা খাবার সম্ভাবনা কমে। বুঝলা মামা, সবই ধান্দা, একটু চালাক চতুর না হইলে বার বার ধরা খাইতে হইবো৷ ‘
-‘দোস্ত, ওইখানে বটতলায় মেয়েটারে চিনোস?’
বটতলার দিকে তাকিয়ে কুয়ালে আঙুল দিয়ে মামুন কইলো -‘কোন মাইয়া? কই, কোনো মাইয়াই তো নাই।’
তাকিয়ে দেখি আসলেই কেউ নাই। আশ্চর্য এতো তাড়াতাড়ি গেলো কোথায়?
-‘কিজানি, এইখানেই তো ছিলো। গেছেগা মনে হয়। চল, হলে যাই লাঞ্চ করতে হইবো’
লাঞ্চ করে রুমে এসে ভাবছিলাম একটু ঘুমাবো৷ কিন্তু বালিশ উল্টেই দেখি খাতাটা বালিশের নিচে। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি খাতাটা ট্রাঙ্কে রেখে গেছিলাম। নাকি রাখি নি! কি জানি। নিজের অজান্তেই খাতা খুলে পড়তে লাগলাম।
সতীনাথ ছেলেটা প্রচুর কথা বলে। এতোদিন চুপ করে ছিলো কীভাবে! কথায় কথায় জানতে পারলাম তার বাবা মারা গেছেন, বড় দিদির বিয়ে হয়েছে, ছোট এক বোনের বিয়ে হয়েছে আরেক বোন এবার ৯ বছরে পরলো, তার জন্য ছেলে খোঁজা হচ্ছে। ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দিবে৷ বয়স বেশি হলে আবার ভালো ছেলে পাওয়া যাবে না৷ এদিকে দুর্ভিক্ষের কারণে ছেলেও পাওয়া যাচ্ছে না। কথায় কথায় জানালো তার মা পূর্ব বাংলার মানুষ। বিক্রমপুরের সাবেক জমিদারের মেয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য তার মায়ের বিয়ের পর সূর্যাস্ত আঈনের মারপ্যাঁচের কারণে তার মামারা জমিদারি হারিয়ে সর্বস্ব হয়ে যান।
সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার পরেও জয়নব আসে নি। আমাকে দরজার দিকে উঁকিঝুঁকি করতে দেখে সতীনাথ জানতে চাইছিলো কারো অপেক্ষা করছি কি না। তাকে জয়নবের কথা বলতেই সে আবারো সেই অদ্ভুত চাহনি দিলো। তার ভাষ্য মতে সে নাকি আমার কাছে কোনো মেয়েকেই আসতে দেখে নি৷ তার যে একটা ভুল হচ্ছে এইটা আমি বুঝতেছিলাম। সে আবার বললো যে তাকে জয়নবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। পরিচয় তো করিয়ে দিতে চাচ্ছিলামই কিন্তু জয়নব আজ আর এলো না। সতীনাথ সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগলো যে জয়নব বলতে কেউ আছে কিনা। বিষয়টা আমার পছন্দ হয় নি। ছেলেটাকে আসলেই সহ্য হচ্ছে না। ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম জানি না। তবে ঘুম ভালো হয় নি। উদ্ভট একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আর ঘুম আসে নি। স্বপ্নে দেখলাম আমি আমাদের বড়িতে। কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে সেখানে। বাড়ির সবাই কোনো একটা বিষয়ে চিন্তিত। আব্বাকে দেখলাম অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। এর মধ্যে একটা খাটিয়া বের হলো। লাশ কাফনের কাপড়ে ঢাকা থাকলেও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম এটা দাদাজানের লাশ। বাড়ির মহিলারা কান্নাকাটি করতেছিলো। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত যে ব্যাপারটি লক্ষ্য করলাম তা হলো সেই মহিলাদের মধ্যে জয়নবও বসা ছিলো। জয়নব আমাদের বাড়িতে কি করবে! জয়নবের সাথে চোখাচোখি হতেই সে তার বিখ্যাত রহস্যময় সেই হাসিটা দিলো। সাথে সাথেই ঘুমটা ভেঙে গেলো৷
পাশের বেডে সতীনাথ ঘুমাচ্ছে। বেচারার সাথে খারাপ ব্যবহার করা উচিত হয় নি। সকালে মাফ চেয়ে নিবো। আবার ঘুমুতে যাবো তখনই জয়নবকে দেখলাম আমার দিকে আসছে।
সন্ধ্যায় আসেনি কেনো জিজ্ঞেস করতে যাবো সে আমাকে থাকিয়ে দিয়ে বললো, ‘হজরত, আপনাকে বলেছিলাম আমার ব্যাপারে কারো সাথে কথা না বলতে। আপনি তারপরেও কথা বলেছেন। কাজটা ভালো হয় নি৷ আমার সঙ্গে আপনার আর দেখা হবে কিনা জানি না। আপনাকে কয়েকটা সংবাদ দিতে এসেছি। আপনার দাদাজান মারা গেছেন, আপনার বাবা এখন গদিনশিন পীর। সিলসিলায় আপনার ভাইয়ের তাদশীন (অভিষেক) হবে রজব মাসের ১৫ তারিখ। আপনি যদি আদেশ করেন তবে আমরা সবকিছু বন্ধ করে দিতে পারবো। আপনি কি চান?’
জয়নবের কাছ থেকে আর যাই হোক এইসব কথা আমি আশা করি নি। হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। এইদিকে জয়নব তাগাদা দিচ্ছে কিছু বলার জন্য। কিন্তু আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছিলো না। মোহগ্রস্থের মতো তাকিয়ে ছিলাম জয়নবের দিকে। হঠাৎ সতীনাথ চিৎকার করে উঠায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখি জয়নব নেই আমার তবে আমার বেডে একটা ছোট কাঠের বাক্স। বাক্সটার ভিতরে একটা রূপার পকেট ঘড়ি। সতীনাথটা বড্ড বেশি চেচামেচি করতেছে। ক্যাম্পের ব্রাদাররা এসে তাকে নিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে তাকে দেখলাম আমার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলতেছে ‘অসুর, অসুর, অসুর’
পর্ব_০৪
জয়নবের দেওয়া বাক্সের মধ্যে ঘড়িটা ছাড়াও এক টুকরা কাগজ রাখা৷ কাগজটাতে আমাদের সিলসিলা অনুযায়ী চতুর্দশ উর্ধ্বতন পুরুষ পর্যন্ত বংশতালিকা দেওয়া। বাবার দিক থেকেও মায়ের দিক থেকেও। তবে যে যায়গাটায় ভুল করেছে এটা হলো আমার বাবার পর সিলসিলায় ভাইয়ের বদলে আমার নাম। কেউ একজন ষড়যন্ত্র করছে সিলসিলা নিয়ে বিষয়টা বুঝতে পারতেছিলাম ভালো করেই৷ আর জয়নবও সেই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের কোনো কারণ বুঝতেছিলাম না। আমাকে তো অনেক আগেই অস্বীকার করা হয়েছে। তাছাড়া জন্মের পরেই আকিকার সময় নাম বংশতালিকায় যোগ করা হয় সেখানেও আমার নাম নেই৷ আমাদের পারিবারিক নথি অনুযায়ী আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এই কাগজ বলছে ভিন্ন কথা! বিষয়টা আমাকে বুঝতে হবে। আর এজন্য যেভাবেই হোক জয়নবকে খুঁজে বের করতে হবে। জয়নবের কাছেই আছে এর উত্তর। কিন্তু জয়নবকে পাবো কোথায়! জয়নব বলেছিলো ভাইয়ের তাদশীন রজব মাসের ১৫ তারিখ৷ এখনো দেড় মাস বাকি আছে। জয়নবকে এর ভিতরে না পেলে এলাকায় যেতে হবে একবার। তাদেরকে সাবধান করে দিতে হবে এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে।
এরপরেই খাতাটাতে আবারো হাবিজাবি হিসাব৷ এই খাতায় আর কোনো লেখা নেই। তবে শেষ পাতায় একটা মেয়ের স্কেচ। নিচে লেখা জয়নব। খুব সম্ভব এইটা জয়নবের ছবি অথবা জয়নব এটা এঁকেছে। অন্তত শওকত সাহেবের ছবি আঁকার হাত যে ভালো নয় এটা তো প্রথম দিকের ছবি দেখেই বুঝা গেছে। তবে মেয়েটাকে পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে। কোথায় যেনো দেখেছি। যাক গে, খিদা লাগছে। এর ভিতরে কোন ফাঁকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। যাই নাস্তা করে আসি। মামুনকে একটা ফোন দিতে হবে। তার কাছে নাকি টিউশনি আছে। একটা টিউশনি পেলে মন্দ হতো না। খাতাটা ট্রাঙ্কের ভিতর রেখে দিয়ে বের হলাম।
বের হয়েই গতকালের সেই সিনিয়র ভাইয়ের সাথে দেখা। নাকে ব্যান্ডেজ করা, বেচারা ভালোই ব্যাথা পেয়েছে। যাই সালাম দিয়ে আসি, ‘আসসালামু আলাইকুম, ভাই’। ‘ওয়ালাইকুম সালাম’ বলে আর দিকে তাকিয়েই চমকে উঠে দুই পা পিছিয়ে গেলেন তিনি।
‘ ও তুই! তু তু তু তুমি! ভালো আছো ছোটভাই?’
‘জ্বী ভাই ভালো। আপনি ভালো? নাকটার কি অবস্থা? ‘
‘ এইতো দেখতেই পাচ্ছো ব্যান্ডেজ করা, ছয়টা সেলাই লাগছে। আচ্ছা মজিদ ভাই তোমার কে হন? ‘
‘ কোন মজিদ ভাই?’
‘আরেহ লিডার মজিদ ভাই।’
‘চিনি না ভাই। কেন? উনি কি কিছু করছে?’
‘না, না। তেমন কিছু না। এমনি।’ বলেই তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন তিনি।
বুঝলাম না কিছুই। আমাকে এড়িয়ে চলছেন না তো? আর কে এই মজিদ ভাই? আমাকে উনার কথা জিজ্ঞেস করলেন কেন! বিষয়টা ক্লিয়ার হতে হবে৷ ভার্সিটি গেটের আড্ডাখানায় বসে বসে ডাল পুরি আর পেঁয়াজু খাচ্ছি হঠাৎই ব্যাপারটা ঘটলো। আমার মনে হলো কে যেনো আমার সাথে কথা বলছে, আমাকে ডাকছে, একটানাডেকেই যাচ্ছে। ‘সাফকাত, সাফকাত, সাফকাত’। কিন্তু কাউকেই দেখছি না পরিচিত আশে পাশে। মামুনের ধাক্কাধাক্কিতে সংবিৎ ফিরে পেলাম।
‘কি মিয়া! হা কইরা কি দেখোস! কোনো মাইয়াওতো নাই যে এমনে তাকাইয়া থাকবি! এতোক্ষণ ধইরা ডাকতেছি কোনো খবর নাই।’
‘তুই ছাড়া আর কেউ কি আমাকে ডাকছে?’
‘না তো, আমিই তো ডাকতেছিলাম। দোস্ত কি গাঞ্জা টাঞ্জা মারছো নাকি? উল্টা পাল্টা বকতাছো।’
‘আচ্ছা, বাদ দে। মজিদ ভাই নামের কেউরে চিনোস?’
‘আরেব্বাস, তুই চিনোস না? মজিদ ভাই হইলো এইখানকার সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের সভাপতি৷ হেব্বি পাওয়ারফুল মানুষ। তার সাথে কি দরকার? হুমকি টুমকি দিছে নাকি? অবশ্য তুই যে আকাম করছোত, দেওয়ারই কথা। রতন ভাই হইতাছে মজিদ ভাইয়ের ডান হাত।’
‘রতন ভাইটা আবার কে? ‘
‘মাইরা যার নাক ফাটাইছোস কালকে, সেই রতন ভাই। আচ্ছা দোস্ত থাক, গেলাম। টিউশনিতে যাইতে হইবো।’
‘আরে দাড়া, এরই মধ্যে টিউশনি জুটাইয়া ফেলছোস। আমারে একটা টিউশনি দিস তো।’
‘হুম। আছে একটা। দিবো নে। গেলাম এখন। নইলে লেট হয়ে যাবে’
বলেই চলে গেলো মামুন।
মামুন ছেলেটা অতিরিক্ত কথা বলে। বাপরে। খাওয়া দাওয়া শেষ। এইবার হলে চলে যাই। ভাল্লাগতেছে না কিছু। বিল দিয়ে বের হওয়ার সময়ই আবার মেয়েটাকে দেখলাম। দিনে বটতলায় যাকে দেখেছিলাম। দূরে রাস্তার অপর পাশ থেকে অপলকভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এইবার তোমাকে ছাড়তেছি না। কথা বলতেই হবে। দ্রুত হেটে রাস্তা ক্রস করতে গেলাম ওমনি সামন দিয়ে সাই করে একটা মাইক্রোবাস চলে গেলো। আরেকটু হলেই চাপা পরতাম। ওপর পাশে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা নাই! আমি কি আসলেই তাকে দেখতেছি নাকি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আমার! তবে এখন কেনো জানি মনে হচ্ছে মেয়েটা আমার পরিচিত। পকেট ঘড়িতে সময় দেখলাম সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। ঘড়িটা সকাল থেকে চলছে। আশ্চর্য একটা ঘড়ি একদম নতুনের মতো অথচ এর বয়স তো কমপক্ষে ৭০ বছর হবেই।
দ্রুত পা চালিয়ে হলে চলে আসলাম। এসেই ট্রাঙ্ক খুলে দুই নম্বর খাতাটা বের করে পড়তে লাগলাম। এই খাতাটায় লেখাগুলো বেশ ছাড়া ছাড়া। অনেকটা ডায়েরির মতো, কিন্তু শওকত সাহেব তারিখ ছাড়া ডায়েরি লিখেছেন আরকি৷
এলাকায় যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছিলাম ১লা রজব। ভাইয়ের তাদশীনের আর মাত্র ১৫ দিন বাকি। জয়নবের সাথে আর দেখা হয় নি। যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এমনকি হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা জানিয়েছিলো জয়নব নামের কেউ নাকি ছিলো না। বিশাল একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি এখনো বুঝতে পারতেছি না আমি এই ষড়যন্ত্রের অংশ, নাকি একটা ঘুটি, নাকি আমাকে নিয়েই ষড়যন্ত্র। এইটা বুঝার জন্যই এলাকায় যাচ্ছি। তার বাড়ি থেকে জরুরি খবর এসেছে যাওয়ার জন্য। নিশ্চই কিয়ামত ঘটে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেছে৷ নইলে এতো বছর পরে বহিষ্কৃত পুত্রকে খবর পাঠানোর মতো লোক বাবা নন।
জয়নবের দেওয়া ঘড়িটা নষ্ট৷ সে কি বুঝে নষ্ট ঘড়ি দিলো আমাকে বুঝলাম না। কারিগরকে দেখিয়েছিলাম। তার ভাষ্যমতে এই ঘড়ির কলকব্জা অন্য সব ঘড়ি থেকে আলাদা। এইটা ঠিক করা তার পক্ষে সম্ভব না।
বাড়িতে যাওয়ার পথে স্টিমারে এক রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে জয়নবকে দেখলাম। সে বললো, ‘হযরত, আপনি ঘড়িটাতে আপনার একফোঁটা রক্ত ঢালবেন। ঘড়ির যেকোন স্থান আপনার রক্তের সংস্পর্শে আসলেই চালু হয়ে যাবে। ঘড়ি চালু হলে ইনশাআল্লাহ আমাদের দেখা হবে।’
আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো হাত কেটে ঘড়ির ডায়ালে রাখার কিচুক্ষণের মধ্যেই ঘড়ি চালু হয়ে গেলো। এবং তখনই শুনলাম কেউ একজন আমাকে ডাকছে ‘শওকত, শওকত, শওকত।’
পর্ব_০৫
‘শওকত, শওকত, শওকত’
কেউ আমাকে ডাকছিলো কিন্তু কাউকেই খুজে পাইনি৷ কেমন জানি ভয় ভয় লাগছিলো তখন। যাইহোক এরপর বাড়ি আসা পর্যন্ত আর কোনো উদ্ভট ঘটনা ঘটেনি, জয়নবের দেখাও পাই নি। তবে ঘড়িটা চলছে এখন ঠিকমতো। স্টিমারটা চরায় আটকে গেছিলো, ভয়ে ভয়ে ছিলাম সময়মতো পৌছাতে পারবো কিনা৷ আমাকে আবার ট্রেনও ধরারও তাড়া ছিলো।
এলাকায় আমার জন্য বিশ্ময় অপেক্ষা করছিলো। আমি ভেবেছিলাম ভাইয়ের তাদশীন এর জন্য হয়তো পুরো এলাকা সাজ সাজ করবে কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিলো ভিন্ন। আমাদের এরিয়ায় ঢুকা মাত্রই কেমন জানি একটা গম্ভীর যুদ্ধ যুদ্ধ অবস্থা টের পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো সবকিছু টান টান হয়ে আছে, যেকোনো সময় রক্তের বন্যা বয়ে যাবে, রক্তের বিশ্রী গন্ধও পাচ্ছিলাম। আমার কেনো এমন হচ্ছে বুঝতে পারতেছিলাম না তখন৷ ট্রেন থেকে এলাকার স্টেশনে নামার আগেই মনে হলো এই স্টেশনে নামলে আমার জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে, আমার উচিত পরের স্টেশনে নামা৷ নামবো নাকি নামবো না এইটা ভাবতে ভাবতে ট্রেন ছেড়ে দিলো৷ ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে আমাদের প্রধান খাদেম আর প্রধান লেঠেলকে দেখলাম। তারা খুবসম্ভব আমার অপেক্ষা করছিলেন। তাড়াতাড়ি করে নামতে গেলাম তখনই কেউ আমাকে পেছন থেকে জাপটে ধরলো। আমার আর নামা হয় নি।
আমার অপহরণকারী আমাকে নিয়ে আমাদের উত্তর মহলে নিয়ে এসেছে। এইটা উত্তর মহল বুঝলাম পুরাতন পাথরের দেওয়াল দেখে। আমাদের পুরো এলাকায় এই একটা বাড়িই পুরাতন পাথরের তৈরী। কিন্তু এই বাড়ি আমার প্রপিতামহ পীরসাহেব শেখ আব্দুল করীম আল ইয়ামেন তথা দাদাজানের আগের পীর সাহেব পীর হওয়ার পরপরই পরিত্যক্ত ঘোষণা করে দক্ষিণ দিকে নতুন খানকাহ (রাজধানী বা প্রধান অঞ্চল বা খান/পীর এর কোহ বা গৃহ) বানান। এর আগ পর্যন্ত এটাই ছিলো আমাদের খানকাহ।
আব্দুল করীম পীরসাহেব ছিলেন তার বাবা পীরসাহেব শেখ আব্দুল মজিদ আল ইয়ামেন এর প্রথম সন্তান ও সিলসিলা পীর। শুনা যায় তখন এইটা নিয়ে বেশ জন অসন্তোষ তৈরী হয়েছিলো। আব্দুল মজিদ পীরসাহেবের আরেক ছেলে পীরজাদা আব্দুল মালিক আল ইয়ামেন নাকি এই অসন্তোষের পিছনে ছিলেন। তার পক্ষে তৎকালীন প্রধান খাদেম ও প্রধান লেঠেলও ছিলেন। আব্দুল মালিক পীরজাদাকে সামনে রেখে তারা বিদ্রোহ করার চেষ্টাও করেছিলেন। আর বিদ্রোহের ঘাটি ছিলো এই উত্তর মহল। কিন্তু অন্য লেঠেল ও কয়েকজন প্রভাবশালী খাদেমের বিশ্বাসঘাতকতায় ব্যর্থ হন ও শাস্তি স্বরূপ তাদের তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আব্দুল মালিক ইয়ামেন সাহেবের নাবালক ছেলেকেও একই পরিনতি বরণ করতে হয়। শুধু বেঁচে যায় তার শিশুকণ্যা রুকাইয়া। এরপর থেকে তাদের বংশের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায় নি। আব্দুল করীম পীরসাহেব হয়তো শিশু রুকাইয়া ও তার বংশকে তার গদির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন নি। নইলে সেও রক্ষা পেতো না।
সফলভাবে বিদ্রোহ দমন করে আব্দুল করীম পীরসাহেব উনার খানকাহ দক্ষিণ মহলে স্থানান্তর করেন। তিনি ভয় করছিলেন যে উত্তর মহলের আশেপাশের অঞ্চল তখনো পীরজাদা আব্দুল মালিক সাহেবের অনুসারী ছিলো। এই মালিকিরা আব্দুল করীম সাহেবের কাছে বায়্যাত নিয়েছিলো এই ঘটনারও আট মাস পর। তারপরেও একটা ছোট অংশ, বিশেষ করে প্রধান খাদেম ও প্রধান লেঠেল এর পরিবার কখনোই বায়্যাত দেয় নি। এরপর থেকে উত্তর মহল পরিত্যক্তই ছিলো। আমি ছোটবেলায়ও শুনেছিলাম এখনো নাকি উত্তর মহলে মালিকিদের আনাগোনা পাওয়া যায়। পীরজাদা আব্দুল মালিক আল ইয়ামেন সাহেবের মাজারটাও এখানে৷ আম জনতার কাছে উত্তর মহল তখন থেকেই মালিক মহল নামে পরিচিত।
আমাকে এই মালিকি আস্তানায় নিয়ে আসার কারণটা বোধহয় আমি বুঝতে পারছি। এতোদিনে ষড়যন্ত্রটা কি তা আন্দাজ করতে পারছি। মালিকিদের একটা অংশ চাইছে আমাকে ব্যবহার করে গদি পরিবর্তন করতে। ভাই যাতে সিলসিলা পীর হতে না পারে তাই তাদশীন বরবাদ করার পায়তারা করতেছে তারা। কিন্তু এর মধ্যে জয়নবের ভূমিকাটা এখনো স্পষ্ট নয়।
দুইদিন পর এই অবস্থা থেকে মুক্তি মেলে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় মালিকিদের প্রধান জাফর আস সাদিক এর কাছে৷ তিনি আমাকে পীর হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমার জানা মতে সরাসরি পীর হওয়ার কোনো নিয়ম নেই৷ আগে আসে সিলসিলা পীর তারপর পূর্বতন পীরের ওফাতের পর সিলসিলা পীর নতুন পীর হিসেবে গদিতে বসেন ও পরবর্তী পীর তথা সিলসিলা পীর ঠিক করেন।
জাফর সাহেবের মতে এই নিয়মের ব্যতিক্রম আছে। যদি গদিনশীন পীর কোনো সিলসিলা পীর ঠিক না করে মারা যান তবে তার জীবিত পুত্র সন্তানদের মধ্যে যেকোন একজন পীর হবেন। যদি একাধিক পুত্র সন্তান জীবিত থাকে এবং দুইজনই গদি দাবী করে তবে একমাত্র ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধই নির্ধারণ করে দিবে কে পীর হবে।
তারমানে আমাকে পীর হতে হলে আব্বাজান ও ভাইকে মারা যেতে হবে। সোজা বাংলায় খুন করতে হবে। কোনো সুস্থ মানুষ এইটা সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু তারপরেও তারা আমার সঙ্গে যা করেছে এর জন্য এই প্রতিশোধ নেওয়াই যায়। কিন্তু আমাকে পীর বানিয়ে মালিকিদের কি লাভ?? আমি তো করিমী বংশের ছেলে মালিকি নই।
বোধ হয় আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই জাফর আস সাদিক সাহেব বললেন, মাতা রুকাইয়া এর বিয়ে হয়েছিলো শহীদ প্রধান খাদেমের ছেলের সঙ্গে এবং তাদের নিয়ম অনুযায়ী মেয়েরা মালিকি বংশ পরম্পরা রক্ষা করে আসবে আর ছেলেরা খাদেম বংশ। সেই হিসেবে জাফর সাহেব হচ্ছেন রুকাইয়া সাহেবার পৌত্র। আর আমাকে এই জাফর সাহেবের কণ্যা ফাতিমা কে বিয়ে করতে হবে। তাহলে মালিকি এবং করিমী আবার এক হবে। মালিকিরা তাদের সত্য পীরের জন্য শত বছর অপেক্ষা করেছে এবং দৈববাণী অনুযায়ী আমিই তাদের সত্য পীর৷
জয়নবের কথা জিজ্ঞেস করায় জাফর সাহেব বললেন, জয়নব হচ্ছে একজন জ্বিন। সে মানুষ নয়। এবং সে সহ তার গোত্রের সবাই পীরজাদা আব্দুল মালিক আল ইয়ামেন এর অনুসারী। জয়নব নাকি আমার জন্মের পূর্ব থেকেই আমার দেখভাল করে আসতেছে। জয়নব ছিলো শেখ আব্দুল মালিক সাহেবের খাস দাসী। সে এখনো জীবিত!
জাফর সাহেবের প্রস্তাবে আমার রাজি না হয়েও উপায় ছিলো না। আমি ভিতর থেকে টের পাচ্ছিলাম এটাই সঠিক পথ। আমার সাথে যেমন অবিচার হয়েছে পীরজাদা আব্দুল মালিক সাহেবের সাথেও তেমনি অবচার হয়েছে। এখন বঞ্চিত নিগৃহীতদের এখন একত্র হওয়ার পালা। গদি আমার ও আমার জন্যই অপেক্ষা করছে গদি।
বিষয়টা তো দেখা যাচ্ছে পুরাই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর পরের খাতাটা কই? খাতা মাত্র দুইটা কেনো!!!???
কাহিনি তো এখানে শেষ হওয়ার কথা না। পাগলের মতো পুরো ট্রাঙ্ক ঘাটালাম। কোথাও আর কোনো খাতা নেই। শওকত সাহেবের পরে কি হলো! তিনি কি আদৌ বিদ্রোহ করেছিলেন? তিনি কি সফল হয়েছিলেন? নাকি আবারো ব্যর্থ হন? আমার কান্না পাচ্ছিলো। আমি খুব করে জানতে চাচ্ছিলাম কি হয়েছিলো পরে।
শওকত সাহেব বেশ চালাক মানুষ। এতো বড় দুই খাতার কোথাও তিনি তার ঠিকানা লিখেন নি। সুতরাং তার কোনো বংশধরকেও খুঁজে বের করতে পারবো না। মনের অজান্তেই খাতা দুইটা নিয়ে হল থেকে বের হয়ে ফুডকোর্টে গেলাম। চা খেতে খেতে আর খাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ প্রথম খাতার স্কেচটার দিকে চোখ গেলো। মেয়েটাকে কোথায় দেখেছি এখন মনে পরেছে। এইটাই সেই মেয়ে যাকে গত দুইদিন বটতলা আর গেটে দেখেছিলাম। চেহারার মারাত্মক অদ্ভুত মিল।
হঠাৎ শুনলাম কে যেনো ডাকছে ‘সাফকাত, সাফকাত, সাফকাত। হজরত আপনি সঠিক বুঝেছেন। আমিই জয়নব৷ ডানপাশে বটগাছের দিকে তাকান।’ বটতলায় তাকাতেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো। কোনো সন্দেহ নেই এই মেয়েটাই জয়নব৷ এবং সে আমার দিকেই আসছে।
পর্ব_০৬ (শেষ পর্ব)
মেয়েটা খুব স্বাভাবিকভাবে এসে মুচকি হাসি দিয়ে সামনের বেঞ্চে বসে পরলো। হাসিটাতেই আমার সব ভয় কেটে গেলো, আমি ভুলে গেলাম সে একজন জ্বিন এবং তার বয়স কমপক্ষে ৩০০ বছর।
‘হযরত, আমি জয়নব, আমি আপনাদের মতো মানুষ নই। কোরানে আমাদেরকে জ্বিন বলা হয়েছে। আপনি চাইলে আমাকে চতুর্মাত্রিক জগতের প্রাণী হিসেবে ধরে নিতে পারেন। মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবে ধিরে ধিরে আমাদেরকে আবিষ্কার করার পথেই আছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো তারা কখনোই পারবে না। যেদিন করে ফেলবে সেদিনই আপনাদের জগত আর আমাদের জগতের পতন হবে। সোজা বাংলায় কিয়ামত। হি হি হি হি হি।’ জয়নব হাসছে!
মেয়েটার হাসি আসলেই সুন্দর, শওকত সাহেব হয়তো এই হাসি দেখেই প্রেমে পরেছিলেন।
‘যাক এসব কথা’ জয়নব বলে চললো, ‘আপনি পীরসাহেব হযরত শওকত আল শাহরিয়ার আল ইয়ামেন সাহেবের হাতে লেখা জার্নালের কিছু অংশ পড়েছেন। আপনার বেসিকটা জানা হয়ে গেছে। এখন নিশ্চই বাকি ঘটনা জানতে চান এবং আপনার সাথে এর যোগাযোগটা কি এইটাও জানতে চান?’
জয়নবের প্রশ্নে সংবিৎ ফিরে পেলাম। এতোক্ষণ মেয়েটাকেই দেখছিলাম শুধু। মেয়েটা আসলেই সুন্দরী।
‘হযরত কি কথা শুনেছেন কিছু? কিছু মনে করবেন না প্রায় ৭৫ বছর কোনো কথা বলিনি তাই হয়তো বেশি বেশি কথা বলতেছি। চলুন হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে আপনাকে সব বলছি।’
চায়ের বিল দিয়ে জয়নবের সাথে হাঁটতে লাগলাম আর জয়নব কাহিনী বলে যেতে লাগলো একের পর এক। তবে আশেপাশের লোকজন খুব বিশ্রীভাবে তাকাচ্ছে। বিষয়টা আমার পছন্দ হচ্ছিলো না।
‘জয়নব, নিরিবিলি কোথাও বসে কথা বলা যায় না? এতো মানুষের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলাটা বিরক্তিকর। মানুষ বিশ্রীভাবে তাকায়।’
‘জ্বি হযরত, বসা যায়। মানুষ তাকাচ্ছে কারণ তারা আমাকে দেখছে না। তারা শুধু আপনাকে দেখছে। চলুন আপনাকে নিয়ে নিরিবিলি কোথাও যাই।’
আমি কিছু বলার আগেই কে যেনো পিছন থেকে জাপটে ধরলো। এরপর আমি জ্ঞান হারালাম। ঘটনাটা পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে। আগেও কোথায় যেনো ঘটেছে।
‘সাফকাত, সাফকাত সাফকাত’ কে যেনো ডাকছে। ৩০ ৩৫ বছরের এক যুবক। কাঠের সিংহাসনে বসে ডাকছে।আমি তার সামনে বসে আছি। আগেও উনাকে কোথায় যেনো দেখেছিলাম, মনে পরছে না। ‘আমার জিনিস আমাকে ফেরত দাও নইলে ধ্বংস করো, যতদ্রুত পারো এখান থেকে পালাও।’ আমি উঠে পকেট ওয়াচটা তার হাতে দেওয়ার সময় হঠাৎ পায়ের নিচের পাথরের মেঝে ভেঙে গেলো আমি তলিয়ে যেতে লাগলাম। উপর থেকে সেই লোক হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছিলো আর বললো, ‘আমাকে মাফ করে দিয়ো।’ চারিদিক অন্ধকার।
ধরমরিয়ে লাফিয়ে উঠলাম। এতোক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম! মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। এই পাথরের দূর্গে কখন এলাম আমি!
‘হযরতের ঘুম ভেঙেছে?’ কণ্ঠের মালিকের দিকে তাকালাম। মধ্যবয়স্ক এক লোক, লম্বা দাড়ি, মাথায় পাগড়ী, কেমন একটা নূরানী চেহারা। উনার একপাশে বেশ গাট্টাগোট্টা শক্ত-সামর্থ্য ২৭ – ২৮ বছরের এক যুবক আর অন্য পাশে জয়নব। ‘হযরত, আমি জয়নাল আবেদীন আস সাদিক, আপনার প্রধান খাদেম।’ পাশের যুবক বললো, ‘হযরত, আমি হাসান ইবন তোরাব আস সাঈফ, আপনার প্রধান লেঠেল।’ জয়নব বললো, ‘হযরত, আমি জয়নব, আপনার খাস দাসী।’
“আমাদের বায়্যাত গ্রহণ করুন। আমরা আল্লাহর নামে শপথ করে স্বজ্ঞানে, সুস্থ অবস্থায় সিলসিলা অনুযায়ী আপনি হযরত শওকত আল শাহরিয়ার আল ইয়ামেন পীরসাহেব এর প্রপৌত্র হযরত সাফকাত আল মনজুর আল ইয়ামেনকে পূর্বোক্ত পীরসাহেব এর সিলসিলা পীর হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং আজ হতে আমৃত্যু আপনার অনুগত হিসেবে থাকার প্রতিজ্ঞা করছি। যদি কখনো সজ্ঞানে আপনার অবাধ্য হই তবে আপনি যে শাস্তি দিবেন সেই শাস্তিই মাথা পেতে নিবো।” তিনজন একই সঙ্গে সমস্বরে এই কথাগুলো বলে থামতেই পুরো ঘর অরায় শতাধিক মানুষের “আমীন” শব্দে গম গম করে উঠলো! এরপর ঘন্টাখানেক দাড়িয়ে থেকে সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে হলো। (এটা নাকি ব্যায়াত)
পুরোটা সময় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কেউ একজন অদৃশ্যভাবে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে৷ আমি কোনোকিছুতেই বাঁধা দিতে পারছি না। এসব কি হচ্ছে আমার সাথে! সবার সঙ্গে খাওয়াদাওয়াও করতে হলো। পুরো বুফে সিস্টেম, এইসব আলিশান খাবার দাবার আমার বাপের জন্মে খাওয়া দূরের কথা চোখেও দেখিনি। সব শেষ হওয়ার পর জয়নবের সাথে অন্য এক রুমে এলাম। রুমের একদম মাঝখানে সুন্দর করে সাজানো একটা কিং সাইজের বেড রুমের সাইজ আর আসবাবপত্র দেখে মনে হচ্ছে কোনো ফাইভ স্টার কন্ডো বা স্যুইট।
‘হযরত, আজ আপনার তাদশীন হলো, কাল আপনি গদিনশীন হবেন। তরফ আল ইয়ামেন অঞ্চল ৭৫ বছর পর আবার তাদের পীর ফিরে পেতে যাচ্ছে। কাল আপনার অনেক কাজ। আপনি ঘুমিয়ে পরুন। আমি আপনার পাশেই আছি।’
আমি অবাক হয়ে জয়নবের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে মাথাটা পরিষ্কার হচ্ছে। আমি জয়নবের সাথে ক্যাম্পাসে হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার আর কিছু মনে নেই। এর পরেই সেই স্বপ্ন দেখলাম তারপর ঘুম ভাংলো তারপর এতো নাটক! আমি কোথায়?
বোধহয় আমার অবস্থা বুঝতে পেরেই জয়নব বললো, ‘হযরত, আপনি মালিক মহলে। আপনি পুরো একটা দিন ঘুমিয়েছেন। এখন আপনাকে পীরসাহেব হযরত শওকত আল শাহরিয়ার আল ইয়ামেন সাহেবের বাকি ইতিহাস বলবো। আপনাকে জানতে হবে সবকিছু। এইটা শুধু শওকত পীরসাহেবের না, আপনারও ঘটনা।’
এরপর জয়নব বলতে লাগলো, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলাম। আমার ভয় পাওয়া উচিত ছিলো এক অচেনা অজানা জায়গায় অপরিচিত লোকজনের সাথে অদ্ভূত এক পরিস্থিতিতে আমি পরেছি৷ অথচ কোন এক আজব কারণে আমার কোনো দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে না। মা-বাবার কথা ভেবেও না, কারণ আমি জানি উনারা ভালো আছেন। অদৃশ্য কোনো শক্তি ধীরে ধীরে আসছে আমার মধ্যে টের পাচ্ছি। জয়নব যতই কাহিনির গভীরে যাচ্ছিলো ততই টের পাচ্ছিলাম আমার অতিয়েন্দ্রীয় ক্ষমতা বাড়ছে।
শওকত সাহেব মালিক মহলে আসার পর উনার কাছে মালিকিদের প্রধান খাদেম জাফর আস সাদিক, প্রধান লেঠেল ওয়ালিদ আস সাঈফ এবং জয়নবের জ্বিন গোত্র বায়্যাত গ্রহণ করে। উনাদের সাথে সাথে মালিকিরা শওকত সাহেবের মুরিদ হয়ে যায় এবং তাকে তাদের প্রতিশ্রুত পীর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পীরজাদা মালিক সাহেব মৃত্যুর পূর্বে ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন যে, ‘ করিমি বংশে মালিক সাহেবের মতো দ্বিতীয় জন্মগ্রহণকারী এক পুত্র সন্তান আসবে যে করিমিদের অন্যায় থেকে তরফ আল ইয়ামেন অঞ্চলকে উদ্ধার করবে এবং করিমিদের ধ্বংসের কারণ হবে। করিমিরা শিশু অবস্থায় তাকে হত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হবে। সারা দুনিয়ার যখন যুদ্ধ চলবে তখন সে আত্মপ্রকাশ করবে। ‘
এরপর থেকে গোপনে করিমিদের প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মালিকিরা অনুপ্রবেশ করে অপেক্ষা করছিলো তাদের সত্য পীরের৷ শওকত সাহেবের জন্মের পর থেকে তার দেখভালের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে গুপ্ত মালিকিরা। খাতায় উল্লেখিত ফরিদ চাচা কিংবা ধাত্রী মা এরা সবাই গুপ্ত মালিকি এমন কি স্কুলের কালিপদ স্যারও নাকি গুপ্ত মালিকিদের সমর্থক ছিলেন।
সিলসিলার নিয়ম অনুযায়ী শওকত সাহেবের ভাইয়ের তাদশীন সফল হওয়ার জন্য শওকত সাহেবের বায়্যাতের দরকার ছিলো অথবা দরকার ছিলো শওকত সাহেবের মৃত্যুর এজন্যই তাকে খবর দিয়ে এলাকায় আনা হয়েছিলো যাতে তাকে হত্যা করে তার ভাইয়ের সিলসিলা নিষ্কণ্টক করা যায়। কিন্ত গুপ্ত মালিকিদের জন্য তা সফল হয় নি। তারা এর আগেই এলাকায় অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরী করে আম জনতাকে বায়্যাতের বিরোধী করে তুলতে প্রচেষ্টা নেয় এবং তারা কিছুটা সফলও হয়। এজন্যই শওকত সাহেব এলাকায় এসেই থমথমে অবস্থা দেখতে পান।
শওকত সাহেব বিদ্রোহ করেছিলেন তার নিজের বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তিন দিন ব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তার ভাইয়ের তাদশীন বাতিল হয় ও করিমি বাহিনী আত্ম সমর্পণ করে। বিজয়ী মালিকি বাহিনী করিমিদেরকে বিন্দুমাত্র দয়াও প্রদর্শন করেনি। বিজয়ের উন্মাতাল উচ্ছ্বাসে তারা শওকত সাহেবের পরিবারের সবাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ধ্বংস হয়ে যায় করিমি পরিবার ও তাদের অনুসারীরা। এই নির্মম হত্যাকান্ডের পিছনে সবচেয়ে বড় ইন্ধন ছিলো সহকারী খাদেম আহসান আস সাদিক সাহেবের।
বিজয়ী হয়েও তাই এই নিষ্ঠুর রক্তপাত হজম করতে পারেন নি শওকতসাহেব। গদিনশীন হওয়ার পরে পূর্ণ ক্ষমতা পেয়েই তিনি আহসান আস সাদিক সাহেবকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে বন্দী করেন তার এই উদ্যোগ মালিকিদের একাংশকে ক্ষেপিয়ে তুলে। পীরজাদা মালিক সাহেবের প্রধান খাদেমের আরেক বংশধর আহসান আস সাদিক সাহেবের পরিবার শওকত আল শাহরিয়ার আল ইয়ামেন পীরসাহবের কাছে বায়্যাত নেন নি এবং তাকে সত্যপীর হিসেবে মেনে নেন নি। তিনি বিদ্রোহ করে বসেন। শওকত সাহেব অত্যন্ত শক্তভাবে সেই বিদ্রোহ দমন করে ছিলেন। ততোদিনে তার ও পীরমাতা রুকাইয়ার কোলে আসে শিশুপুত্র আব্দুর রাজ্জাক আল ইয়ামেন। শিশুপুত্রের আগমনের আনন্দে পরাজিত বাকি বিদ্রোহী অংশের সাথে সন্ধি করেছিলেন তিনি। সন্ধি অনুযায়ী তাকে বিদ্রোহী আহসান আস সাদিক এর কন্যা মাইমুনাকে বিয়ে করতে হয়। বিয়ের পর বিদ্রোহী অংশ তারভকাছে বায়্যাত নেয়। এর মধ্যে হঠাৎ করে তার প্রধান খাদেম জাফর আস সাদিক সাহেবের মৃত্যু হলে আহসান আস সাদিক সাহেব প্রধান খাদেম হয়ে যান। ধারণা করা হয় জাফর সাহেবের মৃত্যুর পিছনে আহসান সাহেবের হাত ছিলো।
এরপর সন্ধি থাকা সত্ত্বেও তিনি তার পুত্র আব্দুর রাজ্জাক আল ইয়ামেন এর তাদশীন করতে পারেন নি। বার বার তার এই পুত্রকে হত্যাচেষ্টা করা হয়৷ শেষ পর্যন্ত প্রিয় পুত্রের জীবন বাঁচাতে তিনি তার দেড় বছর বয়সী পুত্রকে তার মা সহ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আহসান সাহেব আশা করেছিলেন তার জন্যা মাইমুনার গর্ভজাত সন্তান হবেন ভবিষ্যৎ পীর। কিন্তু পুত্রশোকে কাতর শওকত বেশিদিন আর গদিতে থাকেন নি।
মাইমুনার গর্ভে সন্তান আসার পরেই তিনি তিনি অসিয়ত করে যান যে, ‘আমার ও রুকাইয়ার পুত্র ও তার পুত্রকে এই গদি থেকে সর্বদা নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। তাদেরকে কেউ কখনো গদিতে বসতে বাধ্য করতে পারবে না ও গদির সঙ্গে কোনো কিছুতে সম্পর্কিত করতে পারবে না এবং তাদের কোনোপ্রকার ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।’
এই অসিয়ত করার কিছুদিন তিনি সিলসিলায় মোহর লাগিয়ে দিয়ে অন্তর্ধানে চলে যান। প্রচন্ড ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও আহসান সাহেব পীরজাদা আব্দুর রাজ্জাক ও তার বংশের কোনো ক্ষতি করতে পারেন নি যেহেতু বায়্যাত এর কারণে তিনি পীরের অবর্তমানে তার অসিয়ত মানতে বাধ্য। অন্তর্ধান করার কারণে গদি খালি ছিলো এবং সিলসিলার নিয়মের মারপ্যাচের কারণে মাইমুনার সদ্যোজাত পুত্রের তাদশীন সম্পন্ন করা যায় নি।
শওকত সাহেব অন্তর্ধানে যাওয়ার আগে তার পকেট ওয়াচটি ত্যাগ করেন ও তার কাটা বন্ধ করে দেন। এই কারণে জয়নবকেও আত্মগোপনে চলে যেতে হয়।
সাবেক প্রধান খাদেম জাফর সাহেবের বংশধররা এরপর তৎকালীন প্রধান খাদেম আহসান সাহেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তাদের এই রেষারেষি চলে পচাত্তর বছর। এর মধ্যে শওকত সাহেবের অসিয়ত অনুযায়ী তার ও রুকাইয়ার পুত্র পীরজাদা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ও তার পুত্রের সিলসিলার সময় শেষ হয়ে যায়। এর ভিতরে তাদেরকে কেউ গদির কথা জানায় নি ও গদিতে বসানোর চেষ্টা করে নি। কিন্তু অসিয়তের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় শওকত আল শাহরিয়ার আল ইয়ামেন এর প্রপৌত্র তথা আমার মাধ্যমে আবার সিলসিলা চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জফর পন্থী মালিকিরা কিছুদিন আগে আহসানপন্থীদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেছে। এখন তারা আমার কাছে বায়্যাত গ্রহণ করেছে। সেই হিসাবে আজ থেকে আমি সিলসিলা পীর ও কাল গদিনশীন হওয়ার পর আমি হবো পীর।
পুরো কাহিনি শুনার পর ঝিম মেরে বসে ছিলাম। আবার ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম। আমাকে মনে হয় কোনোভাবে হিপনোটাইজ করা হচ্ছে। ঘোরের মধ্যেই স্বপ্নে আবার সেই ৩০ ৩৫ বছরের সেই যুবককে দেখলাম। তিনি হাসিনুখে কাঠের সিংহাসনে বসে আছেন। এইবার তিনি আর তার জিনিস ফেরত চান নি। তিনি বললেন, ‘সাফকাত, আমি তোমাকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম। তুমি বুঝোনি, তোমার কাছ থেকে আমার জিনিস সড়িয়ে নিতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। মনে হয় আমাদের পূর্বপুরুষদের অভিশপ্ত গদিতে তোমাকে বসতেই হবে। মনে রাখবে তমার অনুগতদের জন্য তুমি একই সঙ্গে শাসক এবং ধর্মীয় প্রধান। এই গুরু দায়িত্ব পালন করা অতিব কঠিন। আমি আমার বাবার কাছ থেকে এই দায়িত্বের কিছু শিখিনি, তুমিও শিখো নি। আমি নিজে শিখতে ব্যর্থ্য হয়েছিলাম, প্রাসাদ রাজনীতির শিকার হয়েছিলাম। দুয়া করবো যাতে তুমি এই রাজনীতির শিকার না হও এবং দ্রুত সবকিছু শিখে নিয়ে নিজের আয়ত্বে আনতে পারো৷ ঘড়িটা সবসময় সাথে রাখবে। আমার অন্তর্ধানের সময় শেষ হলো প্রায়। তোমার গদিনশীন হওয়ার পর মালিক মহলের পূর্ব পার্শ্বে আমার প্রপিতামহ পিতৃব্য পীরজাদা হযরত আব্দুল মালিক এর মাজারের ডানদিকের অচিহ্নিত মাজারটা আমার। মাজারটা চিহ্নিত করে দিয়ে বাঁধাই করে দিয়ো৷ আল্লাহ হাফিজ, ফী আমানিল্লাহ।’
ঘোর ভাঙার পর দেখি আমি গদিনশীন হয়ে গেছি। হাজারে হাজারে মানুষ বায়্যাত নিচ্ছে। স্বপ্নে যে চেয়ারটাতে তিনি বসেছিলেন সেই চেয়ারে আমি বসা। স্বপ্নটা নিয়ে সন্দেহ থাকার পরেও সমস্ত বায়্যাত শেষে সন্ধ্যার পর প্রধান খাদেম, প্রধান লেঠেল ও জয়নবকে নিয়ে মহলের পূর্বপাশে বলে দেওয়া যায়গায় এসে পীরজাদা আব্দুল মালিক সাহেবের কবরের ডানপাশে সত্যি সত্যিই একটি অচিহ্নিত মাজার আবিষ্কার করি। এই মাজার যে শওকত সাহেবের এই বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকলো না।
মাজার চিহ্নিত করার পর সবাই মাজার জিয়ারত করে মহলে ফিরে এলাম। রাতে জয়নবের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সে আসে নি।
শেষরাতে জয়নব এসে সালাম করে বললো, ‘হযরত, আমার দায়িত্ব শেষ হয়েছে। আমি মালিক সাহেব ও শওকত সাহেবের কাছে করা প্রতিজ্ঞা আমি পূরণ করেছি। আপনি গদিনশীন হয়েছেন, শওকত সাহেবের মাজার চিহ্নিত করা হয়েছে। আমার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। আমারও বয়স হয়েছে আমি সবকিছু থেকে ইস্তফা চাচ্ছি। বাকি সময়টুকু আমি মালিক সাহেব ও শওকত সাহেবের মাজার দেখাশুনা করতে চাই। উনাদের জীবিত অবস্থায় উনাদের খেদমত করতে পারিনি। উনারা আমার পীর ছিলেন আমি এখন উনাদের খেদমত করতে চাই।’
আমি চাচ্ছিলাম জয়নব থাকুক আমার পাশে। কিন্তু জয়নবের কান্না মিশ্রিত চাহনি দেখে আটকাতে পারি নি। তার চাহনিতে ভালোবাসা ছিলো, না পাওয়ার বেদনা ছিলো, পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিলো। জয়নব সত্যিই শওকত সাহেবকে ভালোবেসেছিলো। শওকত সাহেবের এক কথায় সে পচাত্তর বছরের জন্য নিশ্চুপ জীবন বেঁছে নিয়েছিলো। পচাত্তর বছর ধরে সে আড়ালে থেকে আমার দাদাজান আব্বাজান ও আমার দেখভাল করেছে। তার এখন অবসরের প্রয়োজন। সত্যিই প্রয়োজন।
জয়নবকে যাওয়ার অনুমতি দিতেই সে কদমবুসি করে চলে গেলো। আমার ঘুমানো দরকার, কাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে আমাকে পীরের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দীর্ঘ পচাত্তর বছরের পীরহীন সমাজের নব্য পীর আমি, আমার অবেক দায়িত্ব। কিন্তু ঘুম ছেড়ে মালিক মহলের পূর্ব জানালা দিয়ে দেখছি জয়নব উড়ে যাচ্ছে তার মালিকের কাছে, তার শওকতের কাছে।
