নরেন্দ্র মোদি সম্প্র্রতি (মে ২০১৪) বলেছেন, গুজরাতের মুসলিমরা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের তুলনায় ঢের ভাল আছেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি নানা তথ্য দিয়েছেন, যার মূল সূত্র সাচার কমিটির রিপোর্ট। পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় গুজরাটি মুসলমানদের গড় আয় বেশি, সঞ্চয়ও বেশি। গুজরাটি মুসলিমদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা যতটা ছড়িয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে ততটা নয়। সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের উপস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় গুজরাটে অনেক বেশি। যদিও গুজরাচের জনসংখ্যায় মুসলমানদের অনুপাত এ রাজ্যের তুলনায় অনেক কম।

মোদির তথ্য ও পরিসংখ্যানে দু’একটা ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি আছে। যেমন আমাদের দেশে আয়ের কোনও নির্ভরযোগ্য হিসেব পাওয়া যায় না বলে মাথাপিছু ব্যয় দিয়েই একটি পরিবারের বা সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা বিচার করতে হয়। মোদি হয়তো আয় বলতে ব্যয়কেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু আয়ের বদলে ব্যয়ের দিকে তাকালেও দেখব, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের তুলনায় গুজরাটি মুসলিমরা অনেকটাই সচ্ছল, অর্থাৎ তাদের তুলনামূলক মাথাপিছু ব্যয় অনেকটাই বেশি। তেমনই, মোদির দেয়া অন্যান্য পরিসংখ্যানে যে অল্পবিস্তর গাণিতিক ত্রুটিবিচ্যুতি আছে সেগুলো শুধরে নিলেও দেখা যাবে, তার মূল প্রতিপাদ্যটি কিছু ধসে পড়ছে না বরং কোন কোন ক্ষেত্রে আরও জোরদার হচ্ছে। অতএব, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় যে গুজরাটের মুসলিমরা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন, মোদির এ দাবি মেনে নিতেই হবে।

কিন্তু এ ব্যাপারে দুটি বক্তব্য আছে। প্রথমত, মোদি যদি আকারে-ইঙ্গিতে বোঝাতে চান যে, গুজরাটের মুসলমানদের আর্থিক সচ্ছলতার পেছনে তার নিজের একটা মস্ত ভূমিকা রয়েছে, সেটা মেনে নেয়া শক্ত। দ্বিতীয়ত সচ্ছল হলেই যে ভালো থাকা যায় না, গুজরাটের মুসলমান সমাজ তার মস্ত উদাহরণ। আমাদের বক্তব্য দুটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দরকার।

তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উতোর-চাপানের বাইরে গিয়ে যদি একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই, তা হলে গুজরাটি-বাঙালি মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক তফাতের রহস্য অনেকটা বোঝা যাবে। আসল কথাটা খুব সহজ। দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত মুসলমানদের প্রায় সবাই সদ্যোজাত পূর্ব পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। এর একটা কারণ অবশ্যই ভাষার সুবিধা, আর একটা কারণ ভৌগোলিক নৈকট্য। এছাড়াও তৃতীয় একটা কারণ আছে। পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দু মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা দলে দলে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসার ফলে পূর্ব বাংলায় একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, উচ্চ পদগুলো ভরাট করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, কাজেই সচ্ছল ও শিক্ষিত মুসলমানদের সামনে বহু নতুন সুযোগ এসে পড়েছিল। এতদিন হিন্দু প্রতিযোগিতার চাপে পূর্ব বাংলায় সচ্ছল ও শিক্ষিত মুসলমানরা খানিকটা দমে ছিলেন, হিন্দুরা চলে যাওয়ার ফলে তাদের উন্নতিতে আর কোন বাধা রইল না। এপার বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা ওপার বাংলায় নতুন সুযোগের সন্ধান পেলেন।

পশ্চিমবঙ্গের গরিব মুসলমানদের কাছে ওপার বাংলায় চলে যাওয়াটা কিন্তু ততটা আকর্ষণীয় ছিল না। একে তাদের টাকার জোর নেই, তার ওপর শিক্ষা-দীক্ষাও তেমন নেই যে নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে নতুন করে জীবন শুরু করার ঝুঁকি নিতে পারবেন। সব থেকে বড় কথা, তাদের জীবিকার মূলে যে কৃষিক্ষেত্র, পূর্ব বাংলায় সেটা তখনই যথেষ্ট ভিড়াক্রান্ত, নতুন করে আসা পরিযায়ীদের চাপ নিতে সে অক্ষম। কাজেই এ দেশের গরিব মুসলমানেরা মোটের ওপর এ দেশেই রয়ে গেলেন। কিন্তু এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজের চেহারাটা একেবারে হতশ্রী হয়ে পড়ল, সে সমাজে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত তেমন করে আর রইলেন না, কেবল পড়ে রইলেন অসংখ্য গরিব মানুষ।

গুজরাচের ব্যাপারটা অন্য রকম। দেশভাগের পর পূর্ব কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানে পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়ার উৎসাহ সেখানকার সচ্ছল মুসলিমদের ছিল না। ছিল ভাষার ব্যবধান এবং ভৌগোলিক দূরত্ব। তাছাড়া সেখানে বোহরা-খোজা- মেমন সম্প্রদায়ের মতো উচ্চবিত্ত মুসলমানরা পুরুষানুক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্য করে অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছিলেন, যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন। তারা নতুন জায়গায় নতুন করে জীবন শুরু করার ঝুঁকি নিতে যাবেন কেন? এর ফলে গুজরাটি মুসলমান সমাজের চেহারাটা তেমন একটা বদলাল না, যেমন পশ্চিমবঙ্গে বদলে ছিল। গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে ইতিহাস নির্ধারিত সেই তফাৎটা এখনও পুরো মাত্রায় বজায় রয়েছে। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির কোন ভূমিকা বা কৃতিত্ব নেই।

আমাদের অনুমান ঠিক হলে দেখা যাবে, গুজরাটের মতো অন্যান্য রাজ্য, যেখান থেকে দেশভাগের পর অবস্থাপন্ন মুসলমানরা ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে পাকিস্তানে চলে যেতে উৎসাহ বোধ করেননি, সেখানকার মুসলিমদের অবস্থাও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের তুলনায় ভালো। তুলনার জন্য দক্ষিণের রাজ্যগুলোর দিকে তাকানো যেতে পারে। সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৪-০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চলে মুসলমানদের মাথাপিছু মাসিক খরচ ছিল এখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মাথাপিছু মাসিক খরচের ৬২%। দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে এই অনুপাত বেশি : তামিলনাড়ুতে ৮৭%, অন্ধ্রপ্রদেশে ৭১%, কেরলে ৭৯%, কর্নাটকে ৭০%। গুজরাটে এ অনুপাত ৭১%-এর কাছাকাছি। এ সংখ্যাগুলো আমাদের তত্ত্বকে সমর্থন করে।

এ বার আমাদের দ্বিতীয় বক্তব্যে আসি। হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদি আসল কথাটা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। তিনি একবারও বলেননি যে, গুজরাটের মুসলমানরা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের তুলনায় অবস্থাপন্ন হলেও তারা সতত নিরপত্তাহীনতায় ভোগেন। কারণ, সেখানে ঘন ঘন দাঙ্গা বাধে, সেসব দাঙ্গায় হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের ক্ষতি হয় বেশি। অর্থনীতিবিদ অনির্বাণ মিত্র এবং দেবরাজ রায়ের একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধ (‘ইমপ্লিকেশনস অব অ্যান ইকনমিক থিয়োরি অব কনফ্লিক্ট : হিন্দু-মুসলিম ভায়োলেন্স ইন ইন্ডিয়া, প্রকাশিতব্য, জার্নাল অব পলিটিকাল ইকনমি) থেকে জানতে পারছি, ১৯৮৪-৯৮ এই ১৪ বছরে সারাভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার বলি হন ১৫২২৪ জন। এর মধ্যে ৪৪৯৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩০% গুজরাটের; ৪০৩৩ জন অর্থাৎ ২৬%-এর কিছু বেশি মহারাষ্ট্রের। এখানে ‘বলি’ অর্থে দাঙ্গায় হতো ও আহত দুই-ই ধরা হয়েছে।

ওই প্রবন্ধের লেখকদের প্রতিপাদ্য হলো, দাঙ্গার মূল উদ্দেশ্য লুটতরাজ এবং যেহেতু ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, লুটতরাজে তারাই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। প্রবন্ধটিতে দেখানো হয়েছে, যখনই মুসলিমদের ধনসম্পত্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, তখনই দাঙ্গার প্রবণতা বেড়েছে। অর্থাৎ, আহত-নিহতসহ দাঙ্গার ক্ষয়ক্ষতি এবং মুসলিমদের ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধি, এই দুইয়ের মধ্যে একটা সরাসরি সংখ্যাতাত্তি্বক সম্পর্ক আছে। হিন্দুদের সম্পত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে কিন্তু দাঙ্গার কোন যোগাযোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এই বিশ্লেষণ বলে যে, গুজরাটি মুসলমানদের সচ্ছলতাই তাদের নিরাপত্তাহীনতা ও দুঃখ-দুর্দশার কারণ। এরপরও গুজরাটি মুসলমানের সচ্ছলতা নিয়ে বড়াই করা চলে কি?

মূল সমস্যাটা অবশ্য আরও গভীরে। অর্থনৈতিক স্বার্থের ঘেরাটোপ দিয়ে তাকে পুরোটা ধরা যাবে না। দেখা যাচ্ছে, ১৯৮৪-৯৮ সময়ের মধ্যে দক্ষিণের চারটি রাজ্যের সম্মিলিত দাঙ্গা-আক্রান্তের সংখ্যা ১৯২৪, অর্থাৎ মোট আক্রান্তের মাত্র ১২.৬%। অথচ আমরা আগেই দেখেছি, দক্ষিণে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের অবস্থা গুজরাটি মুসলমানদের তুলনামূলক অবস্থার থেকে কিছু খারাপ ছিল না। প্রশ্ন উঠতেই পারে, দাঙ্গার উদ্দেশ্য যদি লুটতরাজই হয়, তাহলে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে ততটা দাঙ্গা হয়নি কেন?

আসলে সব দাঙ্গার পেছনেই একটা দীর্ঘ সাম্প্রদায়িক বৈরিতার ইতিহাস থাকে, যে ইতিহাস দক্ষিণে ততটা ছিল না, যতটা গুজরাট-মহারাষ্ট্রে ছিল। উপরি উক্ত প্রবন্ধের লেখকরাও এখানে ইতিহাসের ভূমিকা স্বীকার করে নিয়েছেন। তারা এ অবস্থার নাম দিয়েছেন প্রাইমরডিয়াল হেট্রেড বা আদিম ঘৃণা। গুজরাচ-মহারাষ্ট্রে মুসলমানদের সচ্ছলতা দাঙ্গাবাজদের প্রলুব্ধ করেছে সন্দেহ নেই কিন্তু সেখানে সর্বব্যাপী ঘৃণার বাতাবরণ না থাকলে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গাগুলো ঘটত না। মনে রাখতে হবে, গুজরাটে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে আসছে, ১৯৬৯ কিংবা ২০০২-এর দাঙ্গা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। বস্তুত, এই বৈরিতার পরিব্যাপ্ত জমিতেই জন্ম নিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, জনসংঘ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি। নরেন্দ্র মোদিও এই দীর্ঘ ঘৃণা ও বৈরিতাকে অতিক্রম করতে পারেননি, সম্ভবত কখনও চেষ্টাও করেননি। উল্টোদিকে এ কথাও জোর দিয়ে বলা দরকার যে, যেসব সংখ্যালঘু উগ্রপন্থিরা দেশজুড়ে তা-ব চালাচ্ছে, নির্বিচারে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে, তারাও এ সাম্প্রদায়িক ঘৃণার ঔরসে জাত।

এখানে বলে রাখি, ২০০২-এর পরও কিন্তু গুজরাটে দাঙ্গার প্রবণতা কমেনি। যেমন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১৩ সময়ের মধ্যে গুজরাতে দাঙ্গার বলি হয়েছেন প্রতি দশ লাখ মানুষে ১৩ জন। ওই সময়ে এর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দেখা গেছে একমাত্র কর্নাটকে, প্রতি দশ লাখে ১৪.৩ জন। কর্নাটক ওই সময় বিজেপির শাসনেই ছিল।

একটা ঘৃণা থেকে জন্ম নেয় আর একটা ঘৃণা, তা থেকে আরও একটা। এর কোন অন্ত নেই। শেষ বিচারে, অর্থ নয়, সচ্ছলতা নয়, শান্তিটাই আসল কথা। কিন্তু এ সরল সত্যটা নরেন্দ্র মোদি বুঝতে চাইবেন কি?

 

(সূত্র : আনন্দবাজার)
অভিরূপ সরকার
[লেখক : কলকাতায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটের অর্থনীতির শিক্ষক]